জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে ১৮ জুলাই একটি অবিস্মরণীয় টার্নিং পয়েন্ট। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো বন্ধ করে দেওয়ার পর যখন আন্দোলনের গতি থমকে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, ঠিক তখনই রাজপথে নেমে আসেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে সারা দেশে সফলভাবে পালিত হয় ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি। তবে দিনটি একই সঙ্গে রক্তাক্ত সংঘর্ষেরও সাক্ষী; পুলিশ ও ছাত্রলীগের সাথে সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ ২৯ জন নিহত এবং অন্তত তিন হাজার মানুষ আহত হন।
১৮ জুলাইয়ের আগেও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যুক্ত ছিলেন। তবে এদিনই প্রথমবারের মতো বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী সংগঠিতভাবে রাজপথে নামেন। সাধারণত রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে দূরে থাকা এসব শিক্ষার্থী আবু সাঈদ, ওয়াসিমসহ নিহতদের হত্যার বিচার এবং বৈষম্যের অবসানের দাবিতে আন্দোলনে যোগ দেন। এদিন ঢাকায় আসিফ হাসান, ইরফান ভূঁইয়া, পারভেজ শাকিল, জাহিদুজ্জামান তানভীন, আল হামীম সায়মন, রাব্বী মিয়া, আসিফ ইকবাল এবং ইমতিয়াজ আহমেদ জাবিরের মতো একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহীদ হন।
এদিনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল এমআইএসটির শিক্ষার্থী শাইখ আসহাবুল ইয়ামিনের মৃত্যু। মিরপুরে পুলিশের রায়ট কার থেকে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হলে ইয়ামিন প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে গাড়ি থেকে সড়কে ফেলে দেওয়া হয়। পরে হাসপাতালে না নিয়ে পুলিশ সদস্যরা তাকে উঁচু সড়ক বিভাজক থেকে নিচে ফেলে দেয় বলে অভিযোগ ওঠে, যা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
রাজধানীর রামপুরা, নতুনবাজার, প্রগতি সরণি, বাড্ডা ও উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সংঘর্ষের একপর্যায়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ভবনে আশ্রয় নিলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ভবনটি ঘিরে ফেলে। পরবর্তীতে র্যাবের একটি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদ থেকে প্রায় ৬০ জন পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সারা দেশে ২২৯ প্লাটুন বিজিবি মোত্যেন করলেও যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, সাভার, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
সংঘাতের মধ্যেই দুপুরে সরকার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেয়। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো সংলাপ নয়।’ একই দিন রাত ৯টার দিকে সরকার সারা দেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়। সে সময় তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক বলেন, ‘গুজব ঠেকাতেই মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে।’
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক যাবের বিন নূর দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ১৮ জুলাই বাংলাদেশের সংগ্রাম ও প্রতিরোধের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যান। তবে অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে তিনি অভিযোগ তুলে বলেন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঐতিহাসিক অবদানকে সরকার যথাযথভাবে মূল্যায়ন ও সংরক্ষণ করেনি। অরাজনৈতিক হওয়ার কারণে মুখের স্তুতি ছাড়া বিশেষ কোনো স্বীকৃতি তাদের দেওয়া হয়নি।
যাবের বিন নূর আরও বলেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রিশোর্ধ্ব শহীদের পাশাপাশি সারাদেশের দেড় হাজার শহীদের আত্মদানকে শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করছি। আমরা সারা জীবন তাদের রক্তের কাছে ঋণী হয়ে রইবো।” তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যারাই আবার এই রাষ্ট্রকে জনগণের থেকে কেড়ে নিতে চাইবে, স্বৈরাচার হতে চাইবে কিংবা বিদেশীদের কাছে সার্বভৌমত্ব বিক্রি করতে চাইবে, তাদের বিরুদ্ধে আবারও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
