ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে ইসলামী সঙ্গীত। “ছড়িয়ে দে ভালোবাসা, শান্তিরই সালাম”….। আর ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, মহাসড়কের ডিভাইডারে থাকা একটি গাছের সাথে লাঠি দিয়ে কালেমা খচিত পতাকা লাগাচ্ছেন সফেদ পাঞ্জাবি টুপি পরা এক যুবক। ভিডিওটির স্ক্রিনে লেখা ভেসে উঠেছে “নিজের চেষ্টা দিয়ে একটু কালেমার দাওয়াতের চেষ্টা…!” ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয়েছে জায়গাটি, ঢাকা-নোয়াখলাী হাইওয়ে রোড।
গত ২ জুলাই ভিডিওটি আপলোড করেছেন “ঘারত্যাড়া শাহজাদা” নামক টিকটক একাউন্টের মালিক মাদ্রাসা শিক্ষক ইমরান হোসেন রাকিব। তার একাউন্ট থেকে শিশু মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ছবি/ভিডিও ধারণ করে ইঙ্গিতপূর্ণ ক্যাপশনযোগে টিকটকে প্রকাশ করার ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর তিনি একাউন্টের নতুন নাম দিয়েছেন ‘মাঁয়াঁবীঁ পিঁচ্চিঁ শাঁহঁজাঁদাঁ’ (ইউজারনেইম romantic_hujor)। এর আগে একই একাউন্টের নাম রেখেছিলেন “রোমান্টিক শাহজাদা”।
রাকিব তার একাউন্ট থেকে শিশু শিক্ষার্থীদের শারিরীকভাবে নির্যাতনের ক্লিপও প্রকাশ করতেন। পাশাপাশি যৌন সুড়সুড়িমূলক বিভিন্ন কন্টেন্টও নিয়মিত আপলোড করতেন তিনি। যদিও সমালোচনা শুরুর পর এসব কন্টেন্ট ডিলিট করে দিয়েছেন।
একদিকে রাকিব যখন মহাসড়কে কালেমার পতাকা লাগাচ্ছেন ‘কালেমার দাওয়াত’ দেয়ার চেষ্টা হিসেবে। অন্যদিকে অবিবাহিত এই মাদ্রাসা শিক্ষক তার একই টিকটক একাউন্ট থেকে নিয়মিত মেয়েদের দাওয়াত দিতেন তাকে ইনবক্সে মেসেজ দেওয়ার জন্য।
মেয়েরা মেসেজ দিলে উনি কী করবেন সেটাও বর্ণনা করেছেন তার পোস্ট করা একটি ভিডিওতে। এক হোটেল রুমে কোন এক পুরুষের খোলা গায়ের ভিডিও পোস্ট করে সেটিতে রাকিব লিখেছেন, “ওই…. তোমার দায়িত্ব মেসেজ দেওয়ার। আমার দায়িত্ব তোমার পা-য়-জামা, প্ল-া জু ভিজিয়ে দেওয়ার..!! কলে কথা বলার পর বলবা জান এবার চুপ করো, আমার নিচে সব ভিজে গেছে মেসেজ দিও প্রিয়!”
এই ভিডিওর মতো বেশ কিছু কন্টেন্টে সরাসরি যৌন বার্তা প্রচার করেছেন তার ফলোয়ারদের উদ্দেশ্যে। এসব ভিডিও বর্তমানে একাউন্টটি থেকে ডিলেট করলেও কয়েকটির প্রমাণ সংরক্ষণ করেছে দ্য ডিসেন্ট।
টিকটকে রাকিব ‘সিঙ্গেল’ নারীদের খুঁজে বেড়ান। তার একাউন্টের বায়োতে লেখা রয়েছে, “সিঙ্গেল ঘাড়ত্যাড়া বেডি আছে নি গো”।
রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার একটি ভিডিও আপলোড করে সেটির স্ক্রিনে রাকিব লিখেছেন, “রাত বারোটা বাজলে ঘড়ির কাটাও একটা আরেকটার উপর উঠে যায়! আর আমরা তো মানুষ।”
এছাড়াও বাচ্চা মেয়েদের মুখ থেকে মাস্ক সরিয়ে গাল টিপে দেয়ার একাধিক ভিডিও আছে এই একাউন্টে। একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ৬/৭ বছরের একটি বাচ্চা মেয়ের গাল টিপে দিচ্ছেন আর ভিডিও স্ক্রিনে লেখা রয়েছে, “ভালোবাসা!”
রাকিবের একাউন্ট থেকে একটি ভিডিও ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে, একটি ৩/৪ বছরের মেয়ে বাচ্চা আরবি পড়ছে। তখন শিক্ষক একটি লাঠি দিয়ে ঐ ছাত্রীর ঠোটে সুড়সুড়ি দিচ্ছেন। ছাত্রীটি কান্না করছে এবং কান্না করতে গিয়ে শিশুটির মুখ খুললে ঐ শিক্ষক তার হাতে থাকা লাঠি শিশুটির মুখে ঢুকিয়ে সুড়সুড়ি ও খোচা দিয়েছেন।
এই ভিডিওটি “পিচ্ছি পোলাপানকে কান্না করাতে ভালোই লাগে” ক্যাপশনে টিকটকে আপলোড করা হয়। এছাড়াও একই পোস্টে লেখা হয়েছে, “কি মায়া করে কান্না করে গো।”
আরও বেশ কয়েকটি ভিডিওতে বাচ্চাদেরকে শারীরিক নির্যাতনের দৃশ্য দেখা গেছে তার একাউন্টে।
রাকিব জানান তিনি বর্তমানে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় মাদ্রাসাতুত তাহফিজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছেন। এর আগে তিনি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার হায়দরগঞ্জ দারুল কোরআন ইসলামিক একাডেমিতে কর্মরত ছিলেন। শিক্ষার্থীদের ভিডিওগুলো ওই মাদ্রাসায় করা। তিনি জানিয়েছেন তার বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগে। তবে বিস্তারিত ঠিকানা দেননি।
এ বিষয়ে হায়দরগঞ্জ দারুল কোরআন ইসলামিক একাডেমির সভাপতি জনাব মোঃ মঞ্জুর আহমেদ ১৭ জুলাই বলেছিলেন, “আমরা এই বিষয়ে অবগত হয়েছি। ভিডিওগুলো দেখেছি। আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি।”
আজ শনিবার আবার যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমাদের মাদ্রাসাটি দুই মাস আগে বন্ধ করে দিয়েছি। রাকিবসহ ৩জন শিক্ষক ছিল। তারা মাদ্রাসার বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে পালিয়েছে। এখন আর মাদ্রাসাটি নেই।”
১৭ জুলাই রাকিব ফেসবুক লাইভে এসে তার করা কয়েকটি ভিডিও তোলা ও প্রকাশ করা নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে দু:খ প্রকাশ করেছেন।
