রাজবাড়ী জেলায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে গরুর প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ (এলএসডি) বা পক্স রোগের সংক্রমণ। গত দেড় মাসে কেবল রাজবাড়ী সদর উপজেলাতেই এই রোগে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ১৫টি গরুর মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ৩০০টি গরু আক্রান্ত হয়েছে। জেলার বাকি চারটি উপজেলাতেও রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় খামারি ও সাধারণ পশু পালনকারীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারি সরবরাহে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন বা টিকা না থাকায় মাঠপর্যায়ে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর পাশাপাশি গ্রামীণ খামারিদের অসচেতনতা, আক্রান্ত হওয়ার শুরুতে অবহেলা এবং দেরিতে পশু হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা শুরু করার কারণে এই ছোঁয়াচে রোগটি দ্রুত এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে বিস্তার লাভ করছে।
সদর উপজেলার ভুক্তভোগী কৃষক মজিদ সরদার তাঁর ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়ে বলেন, তাঁর চারটি গরুর মধ্যে আড়াই মাস বয়সী একটি বাছুর প্রায় দেড় মাস আগে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। স্থানীয়ভাবে অনেক চিকিৎসা করিয়েও বাছুরটিকে বাঁচানো যায়নি। আগে থেকে কোনো টিকা না দেওয়ায় বাকি সুস্থ গরুগুলো নিয়েও তিনি এখন সারাক্ষণ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বাছুর নিয়ে আসা শাহনাজ বেগম নামে এক গৃহবধূ জানান, গত এক মাসে তাঁর ৩টি বাছুর লাম্পি স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত হয়, যার মধ্যে চোখের সামনে দুটি বাছুর মারা গেছে। প্রথমে গ্রামীণ হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করিয়ে কোনো উন্নতি না হওয়ায় বাধ্য হয়ে তিনি হাসপাতালে এসেছেন। বাছুরগুলোর শরীরে প্রথমে ছোট ছোট গুটি দেখা দেয় এবং পরদিনই গলা শক্ত হয়ে শ্বাসকষ্টে ভুগতে ভুগতে মারা যায়।
রাজবাড়ী সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. খায়ের উদ্দিন আহমেদ জানান, আক্রান্ত গরুর শরীরে প্রথমে তীব্র জ্বর, নাক-মুখ দিয়ে তরল পানি পড়া এবং শরীরজুড়ে গুটি দেখা দেয়। পরবর্তীতে এই গুটিগুলো ফেটে গিয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়। সংক্রমণ শরীরের ভেতরের অংশে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। বিশেষ করে আগে থেকে টিকা না দেওয়া ছোট বাছুর এই রোগে আক্রান্ত হলে তাদের বাঁচানো খুবই কঠিন হয়ে পড়ে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, লাম্পি স্কিন ডিজিজ মূলত মশা, মাছি ও ডাসের মাধ্যমে ছড়ানো একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সরকারিভাবে যে পরিমাণ টিকা পাওয়া যাচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। বাজারে বেসরকারি টিকার দাম বেশি হওয়ায় সাধারণ খামারিরা তা কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন। বর্তমানে সীমিত জনবল ও ভ্যাকসিন দিয়েই চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে এবং পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ পেলে রোগের প্রকোপ দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
