যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান সামরিক সংঘাত এখন এক বিধ্বংসী রূপ ধারণ করেছে। চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে ইরানের নির্মাণাধীন একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বিমান বাহিনী। এই হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া হিসেবে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো কুয়েতের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ ও পানি শোধনাগার কেন্দ্রে (ডেসালিনেশন প্লান্ট) পাল্টা আঘাত হেনেছে ইরান। ইরানি এই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় কুয়েতের ওই তেল স্থাপনা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়, যা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জর্ডানের আকাবা শহরের বিমান ও সমুদ্রবন্দরে ইরানের সুনির্দিষ্ট হামলার আশঙ্কাজনক হুমকি রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জর্ডানের আম্মানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস এক জরুরি বার্তায় তাদের নাগরিকদের সেখানে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে। ইতিমধ্যে জর্ডানে ইরানের এক হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত, একজন নিখোঁজ এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। মার্কিন সেনাদের এই প্রাণহানিকে অত্যন্ত দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা ইরানকে কখনই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেব না।’ জবাবে ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আব্দুল্লাহি বলেন, যেকোনো ধরনের মার্কিন আগ্রাসনের দাঁতভাঙা জবাব দিতে ইরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
এদিকে জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের খুজেস্তান প্রদেশের ডারখোভিন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণাধীন সাইটে মার্কিন বাহিনীর রাতভর হামলার খবরটি খতিয়ে দেখছে। আইএইএ এক বিবৃতিতে আশ্বস্ত করেছে যে, কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং তাদের সর্বশেষ পরিদর্শনের সময় সেখানে কোনো পারমাণবিক উপাদান ছিল না, যার ফলে কোনো ধরনের তেজস্ক্রিয় ঝুঁকির আশঙ্কা নেই। তবে সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সব পারমাণবিক স্থাপনার কাছাকাছি সর্বোচ্চ সামরিক সংযম বজায় রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
একই সময়ে কুয়েতে অবস্থিত দুটি মার্কিন প্রধান সামরিক স্থাপনায় বড় ধরনের আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানের সেনাবাহিনী। ইরানি ড্রোনগুলো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ক্যাম্প আল-আদিরির গোলাবারুদ ডিপো এবং আলী আল-সালেম বিমান ঘাঁটির প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও রাডার সিস্টেমে সরাসরি আঘাত হেনেছে। কুয়েতের বিদ্যুৎ, পানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি মন্ত্রণালয় এই ঘটনাকে জঘন্য ইরানি আগ্রাসন বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। অন্য দিকে, বাহরাইনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সফলভাবে বেশ কয়েকটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ব্যর্থ করে দিলেও সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় পুরো বাহরাইনজুড়ে রেড অ্যালার্টের বিমান হামলার সাইরেন বেজে উঠেছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের এই চরম সামরিক উত্তেজনার মুখে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি এবং ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি দোহায় এক জরুরি সংকটকালীন বৈঠকে বসেন। দুই শীর্ষ নেতা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সব পক্ষকে যুদ্ধ পরিহার করে কূটনীতি ও পূর্বে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক মেনে চলার জোরালো আহ্বান জানান। এদিকে লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরের এই যুদ্ধের কারণে ইরাকের তেল মন্ত্রী বাসিম মোহাম্মদ খুদাইর জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর তেলের একক নির্ভরতা কমাতে তাঁরা বসরা থেকে তুরস্ক ও সিরিয়া পর্যন্ত নতুন বিকল্প কৌশলগত তেল পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু করেছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই সংঘাতের তীব্র প্রভাব পড়লেও খোদ ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ক্রমশ নাজুক হয়ে পড়ছে। টানা অষ্টম রাতের মতো মার্কিন সেন্টকমের (CENTCOM) ব্যাপক বোমাবর্ষণে দক্ষিণ ইরানের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বেসামরিক অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে ইরানজুড়ে লোডশেডিং এখন নিয়মিত বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। দেশটিতে চলমান স্কুল-কলেজের সব পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে এবং তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে হাসপাতালের লাইফ সাপোর্টে থাকা রোগীদের জীবন এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
এমন সাঁড়াশি সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখেও দেশের ভেতরে কঠোর অবস্থানে রয়েছে ইরানের প্রশাসন। ইরানের বিচার বিভাগীয় সংবাদ সংস্থা মিজান জানিয়েছে, গত জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় ইসফাহান শহরে চার পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার দায়ে ইরফান এসফানদিয়ারি ও গোল মোহাম্মদ মোহাম্মদি নামে দুই বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। একই সাথে আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সাধারণ জনগণকে সর্বোচ্চ জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার এবং সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার নির্দেশ মেনে দেশব্যাপী শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।







