বিশ্বকাপ শিরোপা অক্ষুণ্ণ রাখার এক অদম্য লক্ষ্য নিয়ে ডান হাতের ভাঙা আঙুল পকেটে পুরে টুর্নামেন্টে এসেছিলেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই ২০২২ আসরের এই গোল্ডেন গ্লাভসজয়ীকে দলে পাওয়া নিয়ে চরম শঙ্কায় ছিলেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। সব আশঙ্কা ও শারীরিক যন্ত্রণা একপাশে সরিয়ে প্রতি ম্যাচেই আর্জেন্টিনার গোলবারের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে যথারীতি দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। যদিও আসরের শুরুর দিকে নামের প্রতি পুরোপুরি সুবিচার করতে পারছিলেন না, তবে মহানাটকীয় ফাইনালে এসে তিনিই হয়ে উঠলেন আলবিসেলেস্তেদের প্রধান যোদ্ধা।
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ম্যাচ খেলেও শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার শিরোপা রক্ষা করতে পারেননি ‘দিবু’ মার্টিনেজ। স্পেনের মাঠ কাঁপানো দাপুটে পারফরম্যান্সের সামনে যেখানে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ থেকে শুরু করে প্রতিটি বিভাগ ছিল পুরোপুরি অসহায়, সেখানে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একা লড়ে গেছেন তিনি। পুরো ম্যাচের ১২০ মিনিটে স্পেনের আক্রমণভাগের একের পর এক গোলমুখী সব মিলিয়ে ১১টি বুলেটগতির শট একাই ঠেকিয়েছেন মার্টিনেজ। অথচ টুর্নামেন্টের সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার জেতা স্পেনের উনাই সিমনের পুরো আসরে সবমিলিয়ে সেভ ছিল মাত্র ১০টি।
ম্যাচের শুরুতেই বিশ্ব ফুটবলের নতুন সেনসেশন লামিনে ইয়ামালের একটি ভয়ংকর শট ঠেকিয়ে নিজের প্রতিরোধ পর্ব শুরু করেন মার্টিনেজ। এরপর একে একে মিকেল ওয়ারজাবালের জোরালো প্রচেষ্টা, দ্বিতীয়ার্ধে আলেক্স বায়েনার কোণাকুণি শট, দানি ওলমোর আক্রমণ, ফেরান তোরেসের বিপজ্জনক হেড, পেদ্রির দূরপাল্লার শট এবং পাউ কুবারসির আরেকটি নিশ্চিত গোলমুখী প্রচেষ্টা প্রতিহত করেন তিনি। একইভাবে আইমেরিক লাপোর্তের শট, নিকো উইলিয়ামসের বুলেট হেড এবং ইয়ামালের চমৎকার ফ্রি-কিকও রুখে দিয়ে আর্জেন্টিনাকে ১০৬ মিনিট পর্যন্ত ম্যাচে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন এই বাজপাখি।
তবে এত অতিমানবীয় লড়াইয়ের পরও ম্যাচের একটি মুহূর্ত আজীবন দিবুকে তাড়া করে বেড়াবে। ম্যাচের ১০৬ মিনিটে নাহুয়েল মোলিনার পেছনে পড়া একটি ক্রস যখন মনে হচ্ছিল মাঠের বাইরে চলে যাবে, ঠিক তখনই নিকো উইলিয়ামস হেডে বলটি ডি-বক্সে ফেরত পাঠান। আর সেই চলন্ত বলেই দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে গোল করে আলবিসেলেস্তেদের জাল কাঁপান ফেররান তোরেস। অনেক ফুটবল বোদ্ধাদের মতে, উইং থেকে আসা সেই ক্রসটি লুফে নেওয়ার সুযোগ ছিল দিবুর, কিন্তু তিনি ক্ষণিকের জন্য সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে নিজের ছয় গজের বক্সেই থেকে যান। আর সেই এক মুহূর্তের সুযোগেই ভেঙে যায় আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয় ও সামগ্রিকভাবে চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ের সোনালী স্বপ্ন।
মূলত সাড়ে তিন বছর ধরে মেসির দলের ব্যাকলাইনের মূল ভরসা ছিলেন এই মার্টিনেজ। কাতার বিশ্বকাপের পর তিনি বুক ফুলিয়ে বলেছিলেন, ২০২৬ সালে জার্সিতে আরও একটি চ্যাম্পিয়ন তারকা যুক্ত করে দেশে ফিরতে চান। কিন্তু ইউরোপা লিগের ফাইনালে ডান হাতের অনামিকা আঙুল ভেঙে যাওয়ার পর ইংল্যান্ডের একাধিক হ্যান্ড স্পেশালিস্ট তাঁকে জরুরি অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিলেও তিনি তা নাকচ করে দেন। শরীরকে প্রাকৃতিকভাবে সেরে ওঠার সুযোগ দিয়ে প্রতি ম্যাচে তীব্র ব্যথানাশক নিয়ে খেলেছেন তিনি। সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়ার পরও ম্যাচ শেষে মাঠের বিধ্বস্ত ও কান্নাভেজা সতীর্থদের একে একে বুকে টেনে নিয়ে, পিঠ চাপড়ে সান্ত্বনা দিয়ে একজন প্রকৃত নেতার মতো সংযত আচরণে সবার হৃদয় জয় করেছেন এই কিংবদন্তি গোলরক্ষক।
