ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খলিল আল-হাইয়ার নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। সোমবার (২০ জুলাই) সংগঠনটি এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়। একাধিকবার ইসরায়েলি প্রাণঘাতী হামলা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া এবং ইরানের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি হামাসের অভ্যন্তরে অন্যতম প্রভাবশালী ও নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।
৬৪ বছর বয়সি এই বর্ষীয়ান নেতা বর্তমানে কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থান করছেন। প্রতিরোধ আন্দোলনের দীর্ঘ লড়াইয়ে তাঁর পরিবার চরম ত্যাগের শিকার হয়েছে; গাজা যুদ্ধ চলাকালে ইসরাইলি হামলায় তাঁর এক ছেলে নিহত হন এবং এর আগের সংঘাতগুলোতেও তিনি তাঁর আরও দুই ছেলেকে হারান। ইসরায়েলি হামলায় ইসমাইল হানিয়া এবং ইয়াহিয়া সিনওয়ারের মতো শীর্ষ নেতারা একের পর এক নিহত হওয়ার পর সংগঠনের প্রশাসনিক ও নীতি-নির্ধারণী কাঠামোতে খলিল আল-হাইয়ার প্রভাব ও প্রয়োজনীয়তা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের অভিযানের পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধে যুদ্ধবিরতির জটিল আলোচনায় খলিল আল-হাইয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এমনকি ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির আলোচনাতেও তিনি হামাসের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের মূল নেতৃত্ব দেন। শীর্ষ নেতা হানিয়া নিহত হওয়ার পর বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের মধ্যে তিনি সর্বাধিক প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন এবং পরবর্তী সময়ে সিনওয়ারের শাহাদাতের পর গঠিত পাঁচ সদস্যের যৌথ নেতৃত্ব পরিষদের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দায়িত্ব সামলান।
গাজায় জন্ম নেওয়া খলিল আল-হাইয়া ১৯৮৭ সালে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকেই এর সাথে সরাসরি যুক্ত। তৎকালীন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁকে একাধিকবার ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি থাকতে হয়েছে। ২০০৭ সালে গাজা সিটির শেজাইয়া এলাকায় তাঁর বাসভবনে ইসরায়েলি বিমান হামলায় পরিবারের একাধিক সদস্য প্রাণ হারান। এরপর ২০০৮ ও ২০১৪ সালের যুদ্ধেও পৃথক হামলায় তাঁর ছেলে হামজা, বড় ছেলে ওসামা, পুত্রবধূ এবং তিন নাতি-নাতনি শহীদ হন।
কয়েক বছর আগে রাজনৈতিক প্রয়োজনে আল-হাইয়া গাজা ছেড়ে কাতারে পাড়ি জমান এবং সেখান থেকেই সমগ্র আরব ও ইসলামি বিশ্বের সাথে হামাসের কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনার দায়িত্ব নেন। ৭ অক্টোবরের হামলা সম্পর্কে তিনি একবার বলেছিলেন, ওই অভিযানের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল কিছু ইসরায়েলি সেনাকে বন্দি করে ফিলিস্তিনি কারাবন্দিদের মুক্তির ব্যবস্থা করা, তবে পরিস্থিতি দ্রুত বড় আকার ধারণ করে। তা সত্ত্বেও তিনি বিশ্বাস করেন, ওই পদক্ষেপের ফলেই স্তিমিত হয়ে যাওয়া ফিলিস্তিন ইস্যু আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে আবারও প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে এ পর্যন্ত ৬৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। যুদ্ধবিগ্রহ ও এই ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্যেও বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক যোগাযোগে আল-হাইয়া নিজের দক্ষতা দেখিয়েছেন; যার একটি বড় উদাহরণ ছিল ২০২২ সালে তাঁর নেতৃত্বে সিরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সঙ্গে বৈঠক, যার মাধ্যমে সিরিয়া ও হামাসের এক দশকের পুরনো বৈরী সম্পর্কের ঐতিহাসিক অবসান ঘটেছিল।







