রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর মোজাফফর হোসেনকে গত শুক্রবার ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে স্থানান্তর করা হয়েছে। পরে রোববার তাকে সামরিক বিমানে করে ঢাকায় নেওয়া হয়। এই স্থানান্তরের কারণ এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে বিভিন্ন তথ্য জানা গেছে।
একটি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল ছিল চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস এবং মামলাটিও কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা হয়। ঘটনাস্থল, মামলার নথি এবং তদন্ত-সংক্রান্ত বিষয়গুলো পর্যালোচনার সুবিধার্থেই তাকে চট্টগ্রামে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হাসান শওকত আলী বলেন, মোজাফফরকে চট্টগ্রামে আনার বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই এবং এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে কোনো সমন্বয়ও করা হয়নি। তার ভাষ্য, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেপ্তারের পরই তাকে সরাসরি সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মেজর মোজাফফর কোর্ট মার্শালে দণ্ডপ্রাপ্ত ও দীর্ঘদিনের পলাতক আসামি হওয়ায় প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে সেনাবাহিনীর বিচারিক ব্যবস্থার আওতায় দেওয়া হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানতে আইএসপিআরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি-উদ-দৌলা চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বিচার হবে দুই ধাপে
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্রের দাবি, মেজর মোজাফফরের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া দুই ধাপে পরিচালিত হবে। প্রথমে ১৯৮১ সালে হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনী থেকে পলায়নের অভিযোগে সামরিক আইনে বিচার হবে। সেই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় কোর্ট মার্শালে পূর্বে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একই মামলায় আগে যাদের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তাদের রায়ের আলোকে মোজাফফরের ক্ষেত্রে কোনো অতিরিক্ত বিচারিক পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে কি না, সেটিও জেনারেল কোর্ট মার্শাল বিবেচনা করবে।
সেনা আইনে পলায়নের শাস্তি
দ্য আর্মি অ্যাক্ট, ১৯৫২ অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল বা ইউনিট ত্যাগ করা, দায়িত্বকালীন অনুপস্থিত থাকা কিংবা বাহিনী থেকে পলায়ন সামরিক অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। আইনের ২৪ থেকে ৫৮ ধারায় এসব অপরাধের বিচার ও শাস্তির বিধান রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অপরাধের বিচার কেবল সামরিক আদালতেই হতে পারে। অপরাধের ধরন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী কারাদণ্ড, চাকরিচ্যুতি বা বিশেষ ক্ষেত্রে আরও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
সাধারণত জেনারেল কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে এসব মামলার বিচার হয়। এতে কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং একজন জাজ অ্যাডভোকেটের আইনি পরামর্শে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বিচার শুরুর আগে অভিযোগ গঠন, তদন্ত এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাইয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, পলায়নের অভিযোগে বিচার শেষ হওয়ার পরই ১৯৮১ সালের হত্যা মামলায় পূর্বে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সামরিক আদালতের বিধি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো বিচারিক প্রক্রিয়া সামরিক আদালতের অধীনেই সম্পন্ন হবে।
উল্লেখ্য, কোর্ট মার্শালের বিচার সাধারণত প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত হয় না। ফলে এ বিচার কতটা উন্মুক্তভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে পর্যবেক্ষক মহলে আগ্রহ রয়েছে।
এদিকে, মেজর মোজাফফরের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মোবাইল ফোনের কললিস্ট গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে কাজ করেছে—এমন তথ্য বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকেও জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।







