জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ বাংলাদেশ নৌবাহিনী কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী গোলাম নাফিজের শেষ ২৪ ঘণ্টার মর্মান্তিক ও বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস প্রকাশ পেয়েছে। ১৮ জুলাই মহাখালীতে আন্দোলনে পুলিশের রাবার বুলেটে আহত হওয়ার পরও তিনি দমে যাননি। ৪ আগস্ট সকালে ফার্মগেটে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একদফা কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তেজগাঁও ট্রাফিক পুলিশের এডিসি তয়াছির জাহানের নেতৃত্বাধীন বাহিনী এবং স্থানীয় আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে তিনি বুকে গুরুতর আঘাত পেয়ে শাহাদাতবরণ করেন।
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় নাফিজ দীর্ঘক্ষণ ফুটওভার ব্রিজের নিচে পড়ে ছিলেন। পরবর্তীতে পুলিশ রিকশাচালক নূর মোহাম্মদকে বাধ্য করে নাফিজের দেহ রিকশার পাদানিতে তুলে দিতে। মাথায় লাল-সবুজ পতাকা বাঁধা নাফিজকে বাঁচাতে রিকশাচালক নূর মোহাম্মদ ও অন্য এক রিকশাচালক উজ্জ্বল অক্লান্ত চেষ্টা চালান। তাঁরা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন চক্ষু হাসপাতাল থেকে পরবর্তীতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যান। ততক্ষণে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই নাফিজ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, নাফিজ নিখোঁজ হওয়ার পর তারা বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজাখুঁজি শুরু করে। নাফিজের বড় ভাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাদানিতে ঝুলতে থাকা ভাইয়ের ছবি দেখে চিনতে পারেন। এরপর মামা আবুল হাশেম ও মামি আফরোজা আক্তার সীমা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে গিয়ে নাফিজের নিথর দেহ শনাক্ত করেন। মর্গ থেকে লাশ নেওয়ার ক্ষেত্রে চরম অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হলে পরিবার দ্রুত নাফিজের মরদেহ দাদাবাড়িতে নিয়ে যায়।
লাশ নিয়ে ফেরার পথে ও দাফনের সময় পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের চরম বাধার সম্মুখীন হয় পরিবারটি। লাশ নিয়ে মূল সড়ক এড়িয়ে রামদা ও দেশীয় অস্ত্রের ভয় উপেক্ষা করে কোমর সমান পচা পানির মধ্য দিয়ে হেটে অবশেষে ৫ আগস্ট সকাল ১০টায় মধুবাগ গণকবরস্থানে নাফিজকে দাফন করা হয়। নাফিজের স্বপ্ন ছিল সেনাপ্রধান হয়ে দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, কিন্তু চব্বিশের বিপ্লব তাঁর সেই স্বপ্ন কেড়ে নেয়।
নাফিজ হত্যার ঘটনায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান এবং সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারসহ ২২ জনকে আসামি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ অভিযোগ দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও এখন পর্যন্ত কেবল সাবেক এডিসি শচীন মৌলিক গ্রেপ্তার হয়েছেন। নাফিজের পরিবার নির্দেশদাতা ও প্রত্যক্ষ হামলাকারী সবার ফাঁসির দাবি জানিয়েছে।
