বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান পরিবর্তনের পরপরই বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য নতুন নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সরকারি মহল, শ্রমিক সংগঠন ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত ২৬ জুলাই হঠাৎ করেই বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে ২ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. জিয়াউল হককে বিপিসির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। চেয়ারম্যান পরিবর্তনের মাত্র চার দিনের মাথায় বিপিসিকে চার দিনের মধ্যে বেসরকারি পর্যায়ে জ্বালানি আমদানি ও বিপণনের নীতিমালার খসড়া তৈরি করে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয় জ্বালানি বিভাগ।
জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, পরিশোধিত জ্বালানি তেল বেসরকারি খাতে দেওয়ার প্রস্তাবের বিরোধিতা এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কিছু প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে আপত্তি তোলার কারণেই রেজানুর রহমান চাপের মুখে পড়েছিলেন। যদিও সরকারিভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
এরই মধ্যে বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (বিওজিসিএল) ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও ফার্নেস অয়েল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আমদানি, সংরক্ষণ, বিক্রি ও বিপণনের অনুমতি চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। গত ২৪ মে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান সায়েম সোবহান আনভীর স্বাক্ষরিত ওই আবেদনে দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসরকারি অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়।
এর আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে, বসুন্ধরা অয়েল বছরে ১৫ থেকে ২০ লাখ টন ডিজেল, প্রায় ২ লাখ টন অকটেন, দেড় লাখ টন পেট্রোল এবং ৮ থেকে ১০ লাখ টন ফার্নেস অয়েল আমদানি ও বাজারজাত করার অনুমতি চেয়েছে। বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য বিপিসি ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে এবং অল্প সময়ের মধ্যে মতামত দিতে বলা হয়।
এই উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেছে জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনগুলো। বাংলাদেশ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের জরুরি সভায় নেতারা অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন জ্বালানি খাতকে ধীরে ধীরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তারা এটিকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত হিসেবে অভিহিত করেন।
ফেডারেশনের মহাসচিব মুহাম্মদ এয়াকুব বলেন, কোনো একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি ও বিপণনের সুযোগ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে পুরো জ্বালানি খাত একটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা হলে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেন তিনি।

ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কায়ছার হামিদ অভিযোগ করেন, জ্বালানি খাতের বিভিন্ন নীতিমালা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত শ্রমিকদের অধিকার ক্ষুণ্ন করছে। একই সঙ্গে বিপিসির আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা সংকুচিত করার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ইস্টার্ন রিফাইনারি, পদ্মা অয়েল, এলপি গ্যাস ও বিপিসির বিভিন্ন সিবিএ নেতারাও অভিযোগ করেন, নতুন নীতিমালা ও প্রশাসনিক নির্দেশনা বাংলাদেশ শ্রম আইন এবং কোম্পানি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তারা এসব সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের একাংশও বেসরকারিকরণ নিয়ে সতর্ক করেছেন। তাদের মতে, বর্তমানে সরকার সরাসরি জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করায় আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা থাকলেও দেশে বড় ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়নি। কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে বাজারের বড় অংশ চলে গেলে মূল্য নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং বাজারে প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, পেট্রোলিয়াম জ্বালানি দেশের কৌশলগত সম্পদ। এটি পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে গেলে ভবিষ্যতে সরকারও একটি শক্তিশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ ভোক্তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল। তাই এ খাতে সামান্য অস্থিরতাও বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল না করে বরং আরও শক্তিশালী করার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।







