সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা দিতে সহায়তা করাকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। হাসপাতালের পরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মো. জসিম উদ্দিন অভিযোগ করেছেন, তাকে চাকরি ছাড়ার হুমকি, হেনস্তা এবং শারীরিকভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। একই ঘটনায় হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (হিসাব) রাসেল মিয়াকেও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীর দাবি, শনিবার (৮ আগস্ট) বেলা পৌনে ১২টা থেকে দুপুর সোয়া ১২টার মধ্যে দুই দফায় এ ঘটনা ঘটে। প্রথমে সূত্রাপুর থানা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ আজিজুল ইসলাম এবং পরে কবি নজরুল কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইরফান আহমদ ফাহিম তাদের অনুসারীদের নিয়ে হাসপাতালে এসে তাকে চাকরি ছাড়তে বলেন এবং নানা ধরনের হুমকি দেন।
জসিম উদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘর্ষে আহত কয়েকজন শিক্ষার্থী এবং তার এক আত্মীয় চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এলে তিনি মানবিক দায়িত্ব থেকে ভর্তি ও চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেন। এ ঘটনাকেই কেন্দ্র করে পরবর্তীতে তাকে লক্ষ্য করে চাপ সৃষ্টি করা হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, প্রথম দফায় তার কক্ষে প্রবেশ করে তাকে হাসপাতাল ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়। পাশাপাশি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। পরে দ্বিতীয় দফায় আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে সঙ্গে নিয়ে ছাত্রদল নেতা তার কক্ষে আসেন এবং তাকে তাৎক্ষণিক হাসপাতাল ত্যাগের নির্দেশ দেন।
পরিস্থিতি জানাতে তিনি হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যাপক ডা. ইফফাত আরার কক্ষে গেলে সেখানেও তাকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন। তিনি দাবি করেন, পরিচালকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়ও তাকে অপমান করা হয় এবং চাকরি ছাড়তে চাপ দেওয়া হয়।
জসিম উদ্দিন আরও অভিযোগ করেন, তাকে অতীতের কিছু ছবি দেখিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়। এরপর থাপ্পড় মেরে দাঁত ফেলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় এবং পরদিন থেকে অফিসে না আসার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তার দাবি, তিনি কোনো রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, সম্পূর্ণ মানবিক কারণে আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা পেতে সহায়তা করেছিলেন। চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা একজন হাসপাতাল কর্মকর্তার স্বাভাবিক দায়িত্বের অংশ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অভিযোগের বিষয়ে সূত্রাপুর থানা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ আজিজুল ইসলাম ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, হাসপাতালের পরিচালকের পিএসকে চাকরি ছাড়তে বলা হয়নি। বরং সম্ভাব্য অপ্রীতিকর পরিস্থিতি থেকে তাকে সতর্ক করা হয়েছিল। তার দাবি, তিনি কাউকে হুমকি দেননি এবং বিষয়টি সিসিটিভি ফুটেজে যাচাই করা সম্ভব।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘর্ষের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা একটি পক্ষের পক্ষে ভূমিকা রেখেছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে তদন্তের আহ্বান জানান তিনি।
একইভাবে কবি নজরুল কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইরফান আহমদ ফাহিমও হুমকির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, জসিম উদ্দিনকে শাসানো বা হুমকি দেওয়া হয়নি। তার দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং এখনও তাদের সহযোগিতা করছেন—এমন অভিযোগ হাসপাতাল প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।
ফাহিমের ভাষ্য, হাসপাতাল প্রশাসনের কাছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। তিনি বলেন, হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য করা হয়নি; বরং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগের কারণে তার চাকরি চালিয়ে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এ ঘটনায় হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যাপক ডা. ইফফাত আরা বলেন, তার কক্ষে কিছু লোক প্রবেশ করে তার ব্যক্তিগত সহকারী ও সহকারী পরিচালককে কক্ষ থেকে বের করে দেয়। তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত করেছেন বলে জানান।
ঘটনার পর হাসপাতালজুড়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের মধ্যে পুরো বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক তদন্ত এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।







