ভারতে তীব্র বিদ্বেষ ও ঘৃণামূলক প্রচারের (হেট ক্রাইম) জেরে বিগত মে থেকে জুলাই—এই তিন মাসে অন্তত ২৫ জন মুসলিম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে এই সংখ্যা ৪৪ ছাড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘সাউথ এশিয়া জাস্টিস’-এর ভারতবিষয়ক প্রকল্প ‘ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকার’-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে নিহত ২৫ জনের মধ্যে ১৫ জনই পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে কিংবা সাজানো এনকাউন্টারে প্রাণ হারিয়েছেন। বাকি ১০ জনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে উগ্রবাদী হিন্দুরা। নিহতদের মধ্যে ১১ বছর বয়সী এক বালিকা এবং ১৬ বছরের এক কিশোরও রয়েছে। সামগ্রিকভাবে বছরের প্রথম সাত মাসে নিহত ৪৪ জনের মধ্যে ১৯ জন নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে এবং ২৫ জন গণপিটুনিতে মারা গেছেন।
সংস্থাটি ২০২২ সাল থেকে তথ্য সংগ্রহ শুরু করার পর চলতি বছরই মুসলমানদের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী হামলা ও নিপিড়নের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদন অনুসারে, উত্তরপ্রদেশ, আসাম, কাশ্মীর, মহারাষ্ট্র এবং সম্প্রতি রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির জয়ের পর পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম নিপিড়নের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার বিজেপির সরকার গঠনের পর রাজ্যটিতে মসজিদ ও মুসলিম মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন।
সহিংসতার পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলমানদের বাড়িঘর ও ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদের নামে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোনো পূর্বঘোষণা বা নোটিশ ছাড়াই রাতের আঁধারে আকস্মিক হামলার কারণে হাজার হাজার মানুষ এক কাপড়ে ঘর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত আটটি রাজ্যে অন্তত তিন হাজারেরও বেশি মুসলমানের বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টও এই ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে সুরক্ষাব্যবস্থা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
আইনি ও প্রশাসনিক স্তরেও ভারতীয় মুসলিমদের কোণঠাসা করার নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ঈদুল আজহার আগে পশু জবাইয়ের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ, সংখ্যালঘু ও মাদরাসা বাজেটে ৬২ শতাংশ বরাদ্দ কাটছাঁট এবং অনগ্রসর শ্রেণির সংরক্ষণ তালিকা থেকে ৭৭টি মুসলিম সম্প্রদায়কে বাদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আসামে বাংলাভাষী মুসলমানদের জোরপূর্বক পুশব্যাক করার অভিযোগ উঠেছে, যেখানে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে যে সীমান্তরক্ষী বাহিনী রাতে শিশুদের সহ পরিবারগুলোকে পুশব্যাক করছে।
প্রতিবেদনে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধিদের সতর্কবার্তার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ভারতের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মুসলিমবিদ্বেষী ও ঘৃণামূলক বক্তব্য এই সহিংসতার পরিবেশ তৈরিতে মূল ভূমিকা রাখছে। মুসলমানদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা বহিরাগত হিসেবে আখ্যায়িত করার কারণে তারা নিজেদের দেশেই ‘বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন। এমনকি গণপিটুনির মামলায় ১৪ জন গোরক্ষককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া একজন মুসলিম বিচারকও চরমপন্থিদের হুমকির মুখে বিশেষ পুলিশি নিরাপত্তায় থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
