ভারতে অনুষ্ঠেয় বহুল আলোচিত ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঢাকার এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে দিল্লিকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে ঢাকা ও দিল্লির একাধিক নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে তাঁর একজন বিশেষ প্রতিনিধি অংশ নিতে পারেন, যদিও এ বিষয়ে এখনও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়নি।
গতকাল সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে এখনও কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি। আমন্ত্রণপত্রের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীকে একক ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং ‘বিমসটেক’ (BIMSTEC)-এর বর্তমান চেয়ারপারসন হিসেবে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এই কূটনৈতিক পার্থক্যটি অনুধাবন করা জরুরি।
এরই মধ্যে গতকাল ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথমবারের মতো সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজনদেরও বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সামনের দিকে এগিয়ে নিতে ইতিবাচক ও সহায়ক পরিবেশ তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সীমান্ত হত্যা ও পুশইনসহ দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে ৫ আগস্ট ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনার দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয়ে বাংলাদেশ তার তীব্র অসন্তুষ্টির অবস্থান ভারতকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে। জবাবে ভারতের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের বিচার বিভাগ বা কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে হেয়প্রতিপন্ন করে, এমন কোনো কর্মকাণ্ড ভবিষ্যতে ভারতের মাটিতে হতে দেওয়া হবে না।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের এই বৈঠক নিয়ে একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের সম্ভাবনা নিয়ে প্রাথমিকভাবে সামান্য আলোচনা হলেও খুব শিগগিরই এমন কোনো সফরের সম্ভাবনা নেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভিভিআইপি সফর-সংশ্লিষ্ট এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর নিয়ে এই মুহূর্তে কোনো প্রস্তুতি চলছে না; বরং বর্তমানে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরের জোর প্রস্তুতি চলছে।
আমন্ত্রণপত্রের ভাষা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের বিতর্ক ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। গত ১৪ জুলাই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাঠানো চিঠিতে তারেক রহমানের নামের আগে ‘প্রধানমন্ত্রী’ শব্দটি উল্লেখ না করে কেবল ‘চেয়ারপারসন অব বিমসটেক’ হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। পদাধিকারবলে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও এই পদবি উল্লেখ না করাকে ঢাকার কর্মকর্তারা অবমাননাকর ও ভারতের একটি ‘কূটনৈতিক কৌশল’ হিসেবে দেখছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক এম. শহীদুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে হেয় করতেই এমন আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বিমসটেক একটি অকার্যকর সংস্থা হওয়ায় এবং ভারত এটিকে সার্কের বিকল্প করার চেষ্টা করায়, এই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি ছিল সম্পূর্ণ একটি সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ। প্রটোকল অনুযায়ী এ ধরনের বৈঠকে নির্দিষ্ট চুক্তি নিয়ে বিস্তারিত কারিগরি আলোচনা হয় না। তবে ভারতীয় হাইকমিশনের এক বার্তায় বলা হয়েছে, নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, ভারতের সরকার ও জনগণ বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও দূরদর্শী মনোভাব নিয়ে কাজ করতে এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে আগামী দিনে সম্পর্ক আরও ভালো করতে আন্তরিকভাবে প্রস্তুত।
