ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান ও কূটনৈতিক তৎপরতা প্রত্যাশিত ফল না দেওয়ায় আবারও কঠোর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের পথে হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের ওপর নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানোর বদলে নিষেধাজ্ঞা জোরদার এবং নৌ অবরোধের মাধ্যমে দেশটির অর্থনীতিকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, ইরানের অর্থনীতিতে বর্তমান নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কতটা গভীর হয়েছে, সে বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ট্রাম্পের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রশাসনের ধারণা, নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞাগুলো আরও কঠোর করা হলে তেহরানকে আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য করা সম্ভব হতে পারে।
ইরানকে পরমাণু কর্মসূচি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ছাড় দিতে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র একপর্যায়ে সামরিক পদক্ষেপ নেয়। তবে তাতেও প্রত্যাশিত রাজনৈতিক ফল না আসায় পরবর্তীতে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে অন্তর্বর্তী একটি শান্তি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য এখনো দূর হয়নি।
সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল এবং তিনি এই মুহূর্তে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযানে যেতে আগ্রহী নন। তবে তেহরানও স্পষ্ট করে জানিয়েছে, কেবল অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই মার্কিন কৌশলকে ব্যর্থতারই ইঙ্গিত বলে মন্তব্য করেছেন।
এদিকে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলকে কেন্দ্র করে দুই দেশের বিরোধ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিনিময়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। তবে ট্রাম্প এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তার প্রভাব ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বাজারে উদ্বেগ বেড়েছে এবং তেলের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও বাড়াচ্ছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক তৎপরতার ব্যয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের ওপর বাড়তি চাপ—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারে ঘাটতি তৈরি হওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান অর্থনৈতিক চাপের কৌশল মূলত সরাসরি সামরিক সংঘাতের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের মাধ্যমে ইরানকে আলোচনায় বসানো সম্ভব না হলে ওয়াশিংটনের সামনে আবারও সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল
