পিতার আকস্মিক মৃত্যুতে গভীর শোকের সাগরে ভাসছেন বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকা লিওনেল মেসি। দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে গত শনিবার (৮ আগস্ট) আর্জেন্টিনার রোজারিওর একটি হাসপাতালে ৬৮ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তাঁর বাবা হোর্হে মেসি। জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়, মেন্টর ও দিকনির্দেশককে হারিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি আবেগঘন ও দীর্ঘ খোলাচিঠি পোস্ট করেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক, যা ভক্তদের হৃদয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।
সদ্য প্রয়াত বাবার উদ্দেশ্যে লেখা ওই খোলাচিঠিতে মেসির ফুটবল ক্যারিয়ার থেকে অনির্দিষ্টকালের বিরতি কিংবা স্থায়ী অবসরের এক স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। চিঠিতে মেসি তাঁর বাবার উদ্দেশ্যে লিখেছেন, ‘তোমাকে ছাড়া আমি কী করব, জানি না। কীভাবে সামনে এগিয়ে যাব, তা–ও জানি না। আমি সারা জীবন শুধু ফুটবলই খেলেছি। এখন আর কত দিন এটা চালিয়ে যেতে পারব, তা নিয়েও আমার মনে সন্দেহ জাগছে।’ একদম শুরু থেকে ছায়ার মতো পাশে থাকা বাবার বিদায়ের পর ফুটবল মাঠে ফেরার তাগিদ যেন হারিয়ে ফেলেছেন এই জাদুকর।
মেসি তাঁর চিঠিতে সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপের স্মৃতি চারণ করে জানান, হোর্হে মেসি তাঁকে বারবার আরেকটি বিশ্বকাপ খেলার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিলেন। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক কয়েক দিন আগে হোর্হে মেসির শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হয়। ফলে এবারই প্রথম কোনো টুর্নামেন্টে মেসি তাঁর বাবাকে পাশে পাননি। টুর্নামেন্ট চলাকালীন মেসি তাঁর মায়ের কাছ থেকে বাবার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতেন এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন যে দল ফাইনালে উঠবে, যাতে সুস্থ হয়ে হোর্হে মেসি অন্তত ফাইনাল ম্যাচটি গ্যালারিতে বসে দেখার সুযোগ পান।
আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠলেও হোর্হে মেসি আর সেখানে উপস্থিত হতে পারেননি। মেসি আক্ষেপ করে লিখেছেন, তিনি টুর্নামেন্টটি জিততে চেয়েছিলেন শুধু তাঁর বাবার হাতে আরেকটি ট্রফি তুলে দেওয়ার জন্য। কিন্তু ইনজুরি ও শারীরিক ক্লান্তির কারণে এবার তাঁর শরীর ও পা তাঁকে সঙ্গ দেয়নি। নিজের সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে চেষ্টা করার পরও ট্রফি জিততে না পারার আক্ষেপ মেসিকে পোড়াচ্ছে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, মেসি দেশে ফেরার পর তাঁর বাবা ভেবেছিলেন আর্জেন্টিনা টাইব্রেকারে ফাইনাল হেরেছে, এবং মৃত্যুর আগে বিশ্বকাপে আসলে কী ঘটেছিল তা নিয়ে বাবা-ছেলের কথা বলার কোনো সুযোগই হয়নি।
ছোটবেলার স্মৃতি হাতড়ে মেসি লিখেছেন, কীভাবে হোর্হে মেসি সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে কাজ থেকে ফিরেই তাঁকে অনুশীলনে নিয়ে যেতেন। হোর্হে মেসি কেবল একজন বাবাই ছিলেন না, একই সাথে তিনি ছিলেন মেসির সেরা বন্ধু এবং ফুটবল এজেন্ট। ক্যারিয়ারের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে কোন ভূমিকা পালন করতে হবে, তা হোর্হে মেসি খুব ভালো করেই জানতেন। মাঠের খেলা নিয়ে কখনো সরাসরি অতিরিক্ত প্রশংসা না করলেও, ছেলের খেলা দেখার আনন্দ ও কষ্ট তিনি নীরবে উপভোগ করতেন।
চিঠির শেষাংশে মেসি তাঁর বাবার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, হোর্হে মেসি ও তাঁর মা তাঁকে যেভাবে মানুষ করেছেন, ঠিক সেই একই আদর্শে তিনি তাঁর নিজের সন্তানদেরও বড় করবেন। বাবাকে ওপর থেকে তাঁদের ওপর নজর রাখার অনুরোধ জানিয়ে ফুটবলের এই জীবন্ত কিংবদন্তি বলেন, ‘আমি তোমাকে খুব মিস করব বাবা। কিন্তু তুমি সব সময় আমাদের সঙ্গেই থাকবে। শান্তিতে থেকো, বাবা। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ। আমি তোমাকে ভালোবাসি।’
