নরসিংদী সদর উপজেলার হাজিপুর এলাকার ক্ষুদ্র কাপড় ব্যবসায়ী তৌহিদ উদ্দিন ভূঁইয়া। শেখেরচর বাবুরহাটে ছোট একটি কাপড়ের দোকান চালিয়ে স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে সংসার চালাতেন তিনি। দুই ছেলে ও এক মেয়ের পড়াশোনার খরচও বহন করতেন নিজের ব্যবসার আয় থেকে।
কিন্তু ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে দুই চোখের দৃষ্টি হারানোর পর তৌহিদের জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন তিনি সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন। দোকান চালানোর সামর্থ্য হারিয়ে পরিবার নিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। এই পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে স্থায়ী কর্মসংস্থান ও সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য সহায়তা চেয়েছেন তিনি।
একসময় ছোট ব্যবসা নিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করতেন তৌহিদ। স্বপ্ন ছিল, সন্তানরা বড় হয়ে সমাজের মানুষের পাশে দাঁড়াবে। বড় ছেলে হবে পুলিশ কর্মকর্তা, একমাত্র মেয়ে বিচারক এবং ছোট ছেলে চিকিৎসক—সন্তানদের নিয়ে এমনই স্বপ্ন দেখতেন তিনি।
তবে ১৮ জুলাই নরসিংদীর জেলখানা মোড়ে পুলিশের গুলিতে দুই চোখ হারানোর পর সেই স্বপ্নগুলোও যেন অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে। দৃষ্টিশক্তির পাশাপাশি হারিয়েছেন স্বাভাবিকভাবে উপার্জন করে পরিবার চালানোর সক্ষমতাও।
দোকান ছেড়ে দিতে হয়েছে
শেখেরচর বাবুরহাটে তৌহিদের কাপড়ের ব্যবসা ভালোই চলছিল। ওই ব্যবসার আয়েই পাঁচ সদস্যের সংসারের খরচ এবং সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় মেটাতেন তিনি। কিন্তু দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর বাধ্য হয়ে দোকানটি অন্যের কাছে দিয়ে দিতে হয়েছে।
বর্তমানে দোকান থেকে পাওয়া সামান্য আয় এবং জুলাই যোদ্ধা হিসেবে পাওয়া সম্মানী ভাতার ওপর নির্ভর করেই কোনোভাবে সংসার চলছে। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে এই অর্থ দিয়ে তিন সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও সংসারের অন্যান্য খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তৌহিদ ভূঁইয়া বলেন, ১৮ জুলাই নরসিংদীর জেলখানা মোড়ে পুলিশের গুলিতে দুই চোখ হারানোর পর তার কাছে পুরো পৃথিবীই অন্ধকার হয়ে গেছে। সন্তানদের স্কুলের বেতন ও পড়াশোনার খরচ সময়মতো দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, গত দুই বছর ধারদেনা করে সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বহন করতে হয়েছে। সরকারের কাছে তার একটাই আবেদন—তার জন্য একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এবং সন্তানদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে সহায়তা করা।
সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তৌহিদ
তৌহিদের স্ত্রী মুনমুন আক্তার বলেন, তার স্বামীই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এখন সংসারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার কেনার টাকাও অনেক সময় থাকে না। সন্তানদের স্কুলের খরচ বহন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, স্বামীর চোখের আলো চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে তাদের তিন সন্তানের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। স্বামীর চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ—সবকিছু মিলিয়ে তারা এখন চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
সরকারের সহায়তার প্রত্যাশা
দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর তৌহিদের প্রধান চাওয়া এখন পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা। পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়ে যায়, সে জন্য সরকারের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছেন তিনি।
তৌহিদের স্বপ্ন ছিল সন্তানরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মানুষের সেবা করবে। কিন্তু পরিবারের বর্তমান আর্থিক বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন ধরে রাখাই এখন তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাই দৃষ্টি হারানো এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর প্রত্যাশা, সরকার তার পরিবারের পাশে দাঁড়াবে এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।







