জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তা ভারতের জন্য নতুন কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি করেছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সম্প্রসারিত হওয়ায় নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের প্রভাববলয় ও নিরাপত্তা হিসাব নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
হাসিনা সরকারের দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বাংলাদেশি ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ট্রানজিট সুবিধা, বিদ্রোহী গোষ্ঠী দমনে সহযোগিতা এবং বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে ঢাকার নমনীয় অবস্থান ছিল এই সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
সমালোচকদের মতে, এর বিনিময়ে ভারত হাসিনা সরকারের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী আচরণ এবং গণতান্ত্রিক সংকটের বিষয়ে অনেকটা নীরব থেকেছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে দীর্ঘদিনের কিছু অমীমাংসিত বিষয়ও জনমনে অসন্তোষ বাড়িয়েছে। ফারাক্কা বাঁধ ও শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রত্যাহার, তিস্তা চুক্তির দীর্ঘসূত্রতা, সীমান্তে প্রাণহানি এবং দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি—এসব বিষয় বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে।
পণ্য রপ্তানিতে ভারতের আকস্মিক নিষেধাজ্ঞাও দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পেঁয়াজসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের রপ্তানি হঠাৎ বন্ধ করার ঘটনায় বাংলাদেশি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনা ভারত সম্পর্কে বাংলাদেশের জনমনে বিরূপ ধারণা আরও শক্তিশালী করেছে বলে মনে করেন সমালোচকরা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতের গণমাধ্যমের একটি অংশের বাংলাদেশবিষয়ক প্রচারণাও দুই দেশের সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনকে ইসলামপন্থি উত্থান হিসেবে উপস্থাপন, সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে অতিরঞ্জিত প্রচারণা এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারতের জনপরিসরে নানা মন্তব্যকে অনেক বাংলাদেশি নিজেদের সার্বভৌমত্বের প্রতি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন।
এদিকে নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। চীনের সঙ্গে অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা ও কৌশলগত যোগাযোগ এবং তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও বাড়ছে। ড্রোন প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা ভারতের কৌশলগত মহলেও গুরুত্ব পাচ্ছে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা ভারতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কাছাকাছি চীনা বিনিয়োগ ও সরবরাহব্যবস্থার বিস্তার ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ বাড়াতে পারে। কারণ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা শিলিগুড়ি করিডোর ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর।
তবে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগও নেই। বাংলাদেশের ওপর কোনো বৈরী বা চীনঘেঁষা শক্তির অতিরিক্ত প্রভাব ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—এটি ভারতের জন্য একটি বাস্তব কৌশলগত বিবেচনা।
সমস্যা হলো, ভারতের এই নিরাপত্তা স্বার্থ বাস্তবায়নের পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে উল্টো ফল দিয়েছে। পানি, বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্কে জনমনে অসন্তোষ বাড়িয়েছে। ফলে ভারত যে অতিরিক্ত প্রভাবকে ধরে রাখতে চেয়েছিল, সেটিই এখন বাংলাদেশের বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
ভারতের আরেকটি বড় কৌশলগত দুর্বলতা ছিল বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। যতদিন ওই রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতাসীন ও জনপ্রিয় ছিল, ততদিন ভারতের কৌশল কার্যকর মনে হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক বৈধতা ও জনসমর্থন দুর্বল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের প্রভাবও কমতে শুরু করে।
এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তৈরি করেছে। কোনো একক বিদেশি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই চীন, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি শক্তিশালী করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের অনেক ছোট ও মাঝারি দেশই নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক বজায় রাখে। ভিয়েতনাম যেমন চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও জাপানের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক পরিচালনা করে, বাংলাদেশও একইভাবে বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে পারে। চীনা বিনিয়োগ, মার্কিন নিরাপত্তা সংলাপ কিংবা তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে তাই শুধু ভারতবিরোধী অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিকল্প বাড়ানোর একটি কৌশলও হতে পারে।
অতএব, বাংলাদেশের বর্তমান কূটনৈতিক বৈচিত্র্য কোনো বিদেশি শক্তির ষড়যন্ত্রের ফল নয়; বরং দীর্ঘদিনের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও পরিবর্তিত আঞ্চলিক বাস্তবতার ফল।
বাংলাদেশের জনগণ এখন একক কোনো শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার পরিবর্তে ভারসাম্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রত্যাশা করছে।
এখন ভারতের সামনে মূল প্রশ্ন হলো—নতুন এই বাস্তবতার সঙ্গে নয়াদিল্লি কীভাবে খাপ খাওয়াবে। পানি বণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়ে বাস্তবসম্মত সমঝোতার মাধ্যমে ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে, তাহলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও স্থিতিশীল হতে পারে।
অন্যদিকে চাপ প্রয়োগ, একতরফা প্রভাব বিস্তার কিংবা বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দুই দেশের দূরত্ব আরও বাড়তে পারে। ভৌগোলিক বাস্তবতা দুই দেশকে পাশাপাশি থাকতে বাধ্য করেছে; এখন প্রয়োজন সেই বাস্তবতাকে পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজে লাগানো।
লেখক: সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
