প্রায় ৩৫ বছর পর সরাসরি সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ক্ষমতাসীন বিএনপি মনোনীত এই প্রার্থী মোট ২৫৫টি ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়ে বঙ্গভবনে যেতে যাচ্ছেন। নির্বাচনে তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী ও এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮টি ভোট।
পূর্ববর্তী ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মেয়াদের আগেই পদত্যাগ করার পর চলতি মাসের শুরুতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। এরপরই বিএনপির পক্ষ থেকে তৎকালীন দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণের পর আগামী পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নেবেন তিনি।
ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে তৃণমূলের রাজনীতি, শিক্ষকতা এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে ভূমিকা রাখা মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হতে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ এক রাজনৈতিক পথ। ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
রাজনীতিতে প্রবেশের আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে উত্তীর্ণ হন। বেশ কিছু বছর ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থাকার পর তিনি পূর্ণাঙ্গভাবে রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ১৯৬০-এর দশকে ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটেছিল।
বিএনপির সবচেয়ে কঠিন ও সংকটময় দিনগুলোতে দলকে সুসংগঠিত রাখতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অত্যন্ত দৃঢ় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন। শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি, বারবার কারাবরণ, দলীয় কোন্দল এবং মামলা-হামলার মুখেও তিনি দেশের ভেতরে থেকে দলীয় ঐক্য বজায় রাখেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় সংকটকালে এই আপসহীন ভূমিকা এবং তাঁর পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক ভাবমূর্তিই তাঁকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসাতে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৪৮ সালে জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুল ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত নম্র, বিনয়ী ও সজ্জন ব্যক্তিত্ব হিসেবে সর্বজনবিদিত। সভা-সমাবেশ কিংবা রাজনৈতিক বিশ্লেষণে প্রতিপক্ষকে ব্যক্তিগত আক্রমণের বদলে সর্বদা মার্জিত ও শালীন বক্তব্য দেওয়ার জন্য তিনি শুধু নিজ দলেই নয়, বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষের কাছেও এক ব্যতিক্রমী শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে দুই কন্যার জনক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছেন। রাজনৈতিক ব্যস্ততার বাইরেও তিনি নাট্যচর্চা, অভিনয় ও আবৃত্তির মতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
