আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কেন্দ্রে রেখেই নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। একই সঙ্গে দলের ভেতরে ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’-এর ধারণা বাতিল করা হয়েছে। শেখ হাসিনাকে নেতৃত্বের কেন্দ্রে রেখে তুলনামূলক কম বিতর্কিত নেতাদের প্রকাশ্য ভূমিকায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
দলটির একাধিক নেতা জানান, শেখ হাসিনা দেশে না থাকলেও তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন নেতৃত্ব দল পরিচালনা করবে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দলটির কেন্দ্রীয় কমিটি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর জেলা, উপজেলা ও থানা পর্যায়ের কমিটি এবং সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।
দলীয় সূত্রের দাবি, নতুন কাঠামোয় আগের অনেক প্রভাবশালী নেতা বাদ পড়তে পারেন। অন্যদিকে সংকটকালীন সময়ে সক্রিয় থাকা কিছু নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করেই নেতৃত্ব
শেখ হাসিনা চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর দেশে ফেরার সম্ভাবনাকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাও দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে তিনি দেশে ফিরে কারাবন্দি হলে কিংবা ভারত থেকে দেশে ফিরতে না পারলে বিকল্প নেতৃত্বের মাধ্যমে দল পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে দলীয় নেতারা জানিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে কোনো ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা মেনে নেবেন না। তাই তাঁকে মূল নেতৃত্বে রেখেই সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
দলীয় নেতাদের আশা, বিএনপি সরকার এর আগেই আওয়ামী লীগের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ তৈরি করবে।
দলটির কয়েকজন নেতা জানান, শেখ হাসিনার নির্দেশ পাওয়ার পরও যারা সক্রিয় হননি, তাঁদের অনেকে সাংগঠনিক দায়িত্ব হারাতে পারেন। একইভাবে পলাতক বা কারাবন্দি নেতা-কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের খোঁজখবর না রাখা নেতাদের বিষয়েও দলের ভেতরে অসন্তোষ রয়েছে।
বিদেশে থাকা নেতাদের যোগাযোগ
প্রায় দুই বছর নিষ্ক্রিয় থাকার পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতা আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন এলাকায় দলীয় নির্দেশনায় ঝটিকা মিছিলের খবরও পাওয়া গেছে। কলকাতা ও দিল্লিতে থাকা দলীয় ইউনিটগুলো এসব কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে বলে সূত্রের দাবি।
ভারতের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই, নেপাল, থাইল্যান্ড ও পর্তুগালে থাকা আওয়ামী লীগের নেতারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছেন।
দলের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও সহযোগী সংগঠনের মিলিয়ে প্রায় ৭০০ নেতা রয়েছেন। এর বাইরে সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার জনপ্রতিনিধিরাও ছিলেন। দলীয় সূত্রের দাবি, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং বাকিরা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছেন।
যুক্তরাজ্যে থাকা বরিশাল অঞ্চলের এক সাবেক মন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে। পরে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হলে অনেকে আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেন।
তবে তাঁর দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু নেতা সক্রিয় থাকলেও অধিকাংশ নেতা এখনো নীরব। শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন সীমিত।
একাধিক নেতৃত্বের কাঠামো
দলীয় নেতারা জানান, ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনাসহ নেতা-কর্মীরা দেশে ফিরলে কীভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে, নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে কে কোন দায়িত্ব পালন করবেন—এসব বিবেচনায় নিয়ে একাধিক রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে।
শেখ হাসিনার নির্দেশনা ও তদারকিতে সম্ভাব্য একাধিক নেতৃত্ব কাঠামো নিয়ে কাজ চলছে। প্রতিটি কাঠামোয় ভিন্ন ভিন্ন নেতাকে সামনে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশ ও বিদেশ থেকে কারা দলীয় নির্দেশনা দেবেন, সে বিষয়েও পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
দলীয় সূত্রের দাবি, কয়েকজন তরুণ নেতা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) সদস্য এবং পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থার কয়েকজন ব্যক্তি এ কার্যক্রম সমন্বয় করছেন।
যাঁদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনা
দলীয় নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও শেখ ফজলুল করিম সেলিম; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম; সাবেক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, শ ম রেজাউল করিম ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল; ডা. হাবিবে মিল্লাত, মোহাম্মদ এ আরাফাত, মৃণাল কান্তি দাস, সাবেক সিলেট সিটি মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, যুবলীগের মাইনুল হোসেন নিখিল এবং ছাত্রলীগের সাদ্দাম ও ইনান নিয়মিতভাবে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে অনলাইনে ও ফোনে যোগাযোগ রাখছেন।
দলীয় সূত্র বলছে, তাঁরা নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন নির্দেশনা ও কর্মপরিকল্পনা দিচ্ছেন।
দলের কয়েকজন সাংগঠনিক সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সংকটকালীন সময়ে সক্রিয় থাকার কারণে জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম, শ ম রেজাউল করিম, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও ডা. হাবিবে মিল্লাত নতুন কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে পারেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় সাবের হোসেন চৌধুরীকেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে দলীয় দিবস ও সাংগঠনিক কর্মসূচিতে অনিয়মিত হলেও বেশ কয়েকজন নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় রয়েছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও অনলাইনে আবার সক্রিয় হয়েছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
এ ছাড়া শেখ হেলাল উদ্দিন, ফজলে শামস পরশ, এস এম কামাল, ড. হাছান মাহমুদ, আলাউদ্দিন নাসিম, লিয়াকত শিকদার, নজরুল ইসলাম বাবু, এনামুল হক শামীম, আমিনুল ইসলাম, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, সুজিত রায় নন্দী, অসীম কুমার উকিল এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগের গাজী মেজবাহ সাচ্চু ও আফজাল বাবুসহ কয়েকজন নেতা বিভিন্ন অনলাইন আলোচনায় যুক্ত হচ্ছেন।
বিদেশেও তৎপরতা
ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা জানান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বিভিন্ন দেশে থাকা দলটির নেতা-কর্মীরা নিজেদের অবস্থান থেকে সক্রিয় রয়েছেন। তাঁরা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বিদেশি দূতাবাসগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন।
নজরুল ইসলাম, আব্বাস আলী চৌধুরী, ড. সিদ্দিক, মহসীন, মো. শওকত ও মো. ফারুকসহ অনেকে এসব কার্যক্রমে সক্রিয় রয়েছেন বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
কারাগারে সাবেক মন্ত্রী-এমপিরা
দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের ১০৭ জন সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য বর্তমানে দেশের ৬৯টি কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৪ জন সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এবং ৭৩ জন সাবেক সংসদ সদস্য। বন্দিদের মধ্যে ১২ জন সাবেক নারী সংসদ সদস্যও রয়েছেন।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের অনেক নেতা-কর্মীও কারাগারে রয়েছেন। নতুন সাংগঠনিক কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে তাঁদের মধ্য থেকেও অনেককে মূল্যায়ন করা হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
টাইমস রিপোর্ট
