বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কুয়েত স্টেশন ম্যানেজার মো. শাহজাহানকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ উঠলেও তাকে দায়িত্বে বহাল রাখা হয়েছে। সবচেয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ ও মুভমেন্ট অর্ডার দেওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেই সিদ্ধান্ত বাতিলের ঘটনা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শাহজাহানের বিরুদ্ধে মানব পাচার, অতিরিক্ত ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং সরকারি ফি ও রসিদ ছাড়াই লাগেজ পার করে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই তাকে কুয়েত স্টেশন থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) কুয়েত স্টেশন ম্যানেজার মো. শাহজাহানকে স্ট্যান্ড রিলিজ ও মুভমেন্ট অর্ডার দেওয়া হয়। কিন্তু পরদিন বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) কোনো বিস্তারিত কারণ উল্লেখ না করেই ওই আদেশ প্রত্যাহার করা হয় এবং তাকে আগের দায়িত্বেই বহাল রাখা হয়।
বিমানের গ্রাউন্ড সার্ভিসেসের ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ফারহানা আক্তারের স্বাক্ষর করা এক দাপ্তরিক চিঠিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বুধবার ইস্যু করা শাহজাহানের মুভমেন্ট/রিলিজ অর্ডার বাতিল করা হয়েছে।
মাত্র এক দিনের ব্যবধানে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ঘটনায় বিমানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের প্রশ্ন, গুরুতর অভিযোগের পর একজন কর্মকর্তাকে সরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সেটি এত দ্রুত কেন বাতিল করা হলো।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কারও বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকার পর তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে আবার একই পদে বহাল করা হলে বিষয়টি ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির আশঙ্কা তৈরি করে। অভিযোগের সত্যতা তদন্ত করে প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পেছনে কোনো প্রভাব কাজ করেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা উচিত।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ মহাব্যবস্থাপক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মহিউদ্দিন আহমেদ অবশ্য বিষয়টিকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য, বিমানের প্রয়োজন অনুযায়ী কাউকে কোনো দায়িত্বে রাখা বা সরিয়ে নেওয়া হয়। ব্যবস্থাপনা মনে করেছে, আপাতত শাহজাহানকে কুয়েতেই রাখা প্রয়োজন—এ কারণেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়ে থাকতে পারে।
১৪ যাত্রীর মধ্যে ১২ জনের অতিরিক্ত ব্যাগেজ
কুয়েত থেকে ঢাকাগামী বিজি-৩৪৪ ফ্লাইটে বিমানের নিরাপত্তা বিভাগের ডিজিএমের আকস্মিক তল্লাশিতে ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে।
তল্লাশি করা ১৪ জন যাত্রীর মধ্যে ১২ জনের কাছে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত ব্যাগেজ পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব অতিরিক্ত ব্যাগেজের বিপরীতে নিয়ম অনুযায়ী সরকারি ফি নেওয়া হয়নি এবং সরকারি রসিদও দেওয়া হয়নি।
অভিযোগ আরও রয়েছে, অতিরিক্ত ব্যাগেজ বাবদ আদায় করা অর্থ সরকারি রাজস্বে জমা না দিয়ে অন্যভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। বিষয়টি শুধু আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; নির্ধারিত ওজনসীমা ও উড়োজাহাজের নিরাপত্তার বিষয়টিও এর সঙ্গে জড়িত।
একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি ফ্লাইটে এত বিপুল অতিরিক্ত ব্যাগেজ কীভাবে নিয়মিত প্রক্রিয়ার বাইরে চলে গেল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
একই স্টেশনে স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্ব পালন
কুয়েত স্টেশন ঘিরে শাহজাহান ও তার স্ত্রী শামিমা পারভীনের একই স্টেশনে দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রভাব খাটিয়ে তারা দুজনই একই বিদেশি স্টেশনে দায়িত্ব ধরে রেখেছেন।
একই বিদেশি স্টেশনে স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্ব পালন নিয়ে বিমানের অভ্যন্তরে আগে থেকেই আলোচনা থাকলেও কার্যকর কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তদন্তের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন
কুয়েত স্টেশনের অনিয়ম তদন্তে কমিটি গঠন করা হলেও সেই তদন্তের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের অভিযোগ, ঢাকায় বসে কুয়েতের ঘটনা পুরোপুরি তদন্ত করা সম্ভব নয়—এমন যুক্তিতে তদন্তের পরিধি সীমিত রাখার চেষ্টা হয়েছে। অথচ আকস্মিক তল্লাশিতে ১৪ জনের মধ্যে ১২ জনের অতিরিক্ত ব্যাগেজ পাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় মাঠপর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না হলে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা কঠিন হবে।
এদিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বিমানের ভেতরে একটি প্রভাবশালী অসাধু চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। তাদের দাবি, কুয়েত স্টেশন ম্যানেজারকে নিয়ে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ঘটনাও বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
