দেশের ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই কয়েক শ মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। একই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুও। সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ও অক্টোবরের শুরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে অন্তত ১৫ জেলায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি বলে জানিয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।
এ পরিস্থিতিতে আজ শনিবার থেকে সারা দেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করছে সরকার। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা থেকে কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিন মাসব্যাপী এই কর্মসূচিতে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবক ও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আইইডিসিআর ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহগুলোতে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, পিরোজপুর, নারায়ণগঞ্জ, ঝালকাঠি, কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, বরিশাল, বরগুনা, বান্দরবান ও পটুয়াখালীতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও কীটতত্ত্ববিদেরা বেশ কিছুদিন ধরেই সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কার কথা বলে আসছেন। গত ৯ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিতও জানিয়েছিলেন, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ ও অক্টোবরের শুরুতে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ প্রকোপ বা ‘পিক’ সময় আসতে পারে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রতি শনিবার পরিচ্ছন্নতা ও প্রচার কার্যক্রম চালানো হবে এবং এই কর্মসূচি তিন মাস চলবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরও নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কাজে যুক্ত করা হবে।
বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ৪৯ হাজার ২২০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মারা গেছেন ১৪১ জন।
মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে ডেঙ্গুতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছিল। জুনে মারা যান ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন এবং আগস্টে ৪৩ জন। সেপ্টেম্বরের প্রথম ১১ দিনেই মারা গেছেন ৪৪ জন।
অর্থাৎ, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসেই আগের মাসের তুলনায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে খুলনা বিভাগে। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি হলেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা বেশি। এখন পর্যন্ত আক্রান্তদের ৬২ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮ শতাংশ নারী। অন্যদিকে মৃতদের ৫২ শতাংশ নারী ও ৪৮ শতাংশ পুরুষ।
ডেঙ্গুর কোন ধরন বেশি
আইইডিসিআর এ বছর আক্রান্ত ৭১ জনের নমুনা বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, ৯১ দশমিক ৫ শতাংশ সংক্রমণের জন্য দায়ী ডেনভি-৩। বাকি ৮ দশমিক ৫ শতাংশ সংক্রমণ ঘটছে ডেনভি-২-এর কারণে। বরগুনা, বান্দরবান ও পিরোজপুরে ডেনভি-২-এর সংক্রমণ পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন রয়েছে—ডেনভি-১, ডেনভি-২, ডেনভি-৩ ও ডেনভি-৪। কোনো ব্যক্তি একটি ধরনে আক্রান্ত হওয়ার পর ওই নির্দিষ্ট ধরনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করেন। তবে অন্য তিন ধরনের ভাইরাসে পরবর্তী সময়ে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
প্রথমবারের পর দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে। তৃতীয়বার আক্রান্ত হলে সেই ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে। আইইডিসিআরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর চারটি ধরনই সক্রিয় রয়েছে।
দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, ডেঙ্গু এমন একটি রোগ, যা কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের ঘাটতি এবং জনগণকে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে না পারায় ডেঙ্গু এখন স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রকোপ প্রথম দেখা দেয় ২০০০ সালে। শুরুতে রোগটি মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরকেন্দ্রিক ছিল। ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে ডেঙ্গু।
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, ডেঙ্গু মোকাবিলায় স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ওপর এবং আক্রান্তদের চিকিৎসার দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর থাকলেও দুই পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ যথেষ্ট দৃশ্যমান নয়।
আগের পরামর্শও বাস্তবায়িত হয়নি
২০১৭ সালে ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রোগতত্ত্ববিদ ড. কে কৃষ্ণমূর্তিকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি ২২ পৃষ্ঠার একটি পরিকল্পনা তৈরি করেন। সেখানে রোগতত্ত্ববিদ, কীটতত্ত্ববিদ, অণুজীববিজ্ঞানী, তথ্য-শিক্ষা-যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে দ্রুত সাড়া দেওয়ার দল গঠনের সুপারিশ করা হয়েছিল। পাশাপাশি ১২টি মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।
২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জ্যেষ্ঠ কীটতত্ত্ববিদ বি এন নাগপালও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, শুধু সিটি করপোরেশনের কর্মীদের দিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কারণ এডিস মশা ঘরের ভেতরে টেবিল-চেয়ার, সোফা, বিছানা, পর্দা ও আলমারির আড়ালের মতো অন্ধকার ও আর্দ্র জায়গায় অবস্থান করে।
সারা দেশে সমন্বিত উদ্যোগের দাবি
ডেঙ্গু এখন আর শুধু ঢাকার রোগ নয়। ঢাকার পর খুলনা ও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। সম্প্রতি পিরোজপুরে এবং গত বছর বরগুনায় ডেঙ্গুর প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, শুধু রাজধানী বা সিটি করপোরেশনকেন্দ্রিক মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। দেশের পৌরসভা ও গ্রামাঞ্চলেও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কর্মসূচি প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন সরকারের নতুন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। রেড ক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি তিন মাস পর কর্মসূচির মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এই কার্যক্রম শুধু তিন মাস নয়, সারা বছর এবং কয়েক বছর ধরে চালিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সফল হতে হলে মশা নিধন, পরিচ্ছন্নতা, জনসচেতনতা, চিকিৎসা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত করা জরুরি।
