সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সরকার এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে না এলে নতুন আন্দোলনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বৃহস্পতিবার রাতে সংসদের অধিবেশন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সর্বশেষ আন্দোলনের অন্যতম সূত্রপাত হয়েছিল মেধার যথাযথ স্বীকৃতির দাবিকে কেন্দ্র করে। এখন সেই মেধাকে ‘কবর দেওয়ার’ জন্য নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি চাকরিতে ভাইভার নম্বর বাড়িয়ে দলীয় আনুকূল্যের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, সরকার যদি সিদ্ধান্তটি সংশোধন না করে, তাহলে নতুন আন্দোলন ঠেকানো কঠিন হবে। তবে তাঁরা এমন পরিস্থিতি চান না, যে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার ও সংসদ এসেছে, একই ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হোক।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়েও সরকারের বিরুদ্ধে অনীহার অভিযোগ করেন জামায়াত আমির। তাঁর দাবি, জনগণের রায়কে পাশ কাটিয়ে সরকারের পছন্দ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক অঙ্গীকার ভোটের সময় একরকম এবং পরে তা বাস্তবায়ন না করা জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মেনে না নেওয়ার কারণে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণভোটের রায় উপেক্ষা করা দেশ, জাতি বা কোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই কল্যাণকর হবে না। ভবিষ্যতে এটি দেশের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তিনি জানান, তাঁরা সংসদে থাকা পর্যন্ত গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে যাবেন। শেষ পর্যন্ত জনগণের রায় বাস্তবায়িত হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। তবে এর মধ্যে দেশের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তাঁরা শুধু বিরোধিতা করার জন্য বিরোধী দল হতে চান না। সরকার ভালো উদ্যোগ নিলে তাঁরা সমর্থন করবেন। আর ভুল বা ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে প্রতিবাদ ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।
র্যাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাহিনীটি দেশের মানুষের ওপর চরম জুলুম করেছে। র্যাব বিলুপ্ত করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠন করা হলেও যদি র্যাবের স্থাপনা, লজিস্টিক ও জনবল নতুন বাহিনীতে স্থানান্তর করা হয়, তাহলে প্রকৃত পরিবর্তন হবে না। এটি কেবল ‘বোতল পরিবর্তন’-এর মতো হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ কমিশনের ক্ষমতা কমানোর বিষয়েও আপত্তি জানান জামায়াত আমির। তাঁর অভিযোগ, নতুন আইনের মাধ্যমে এসব কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা কমিয়ে সরকারকে সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
বিরোধী দলের আসনে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া এবং তহবিল বরাদ্দের ক্ষেত্রেও বৈষম্যের অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা আগে ও বেশি বরাদ্দ পাচ্ছেন, অথচ বিরোধী দল বঞ্চিত হচ্ছে।
লংমার্চ প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এটি কোনো একক দাবিকে কেন্দ্র করে হয়নি। গণভোট, প্রশাসনের দলীয়করণ বন্ধ, বৈষম্য দূর করা, মানুষের জীবনযাত্রার দাবি এবং শিল্প, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ—এমন ছয়টি দাবিকে সামনে রেখে লংমার্চ করা হয়েছে। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে দ্বিতীয় লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, তাঁদের দাবিগুলো কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়; এগুলো জনগণের অধিকারের পক্ষে। এসব বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না। তাঁরা মানবিক, বৈষম্যহীন ও ন্যায়-ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চান।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন জামায়াত আমির। তাঁর অভিযোগ, দায়িত্ব নেওয়ার আগে সরকার পূর্ণ স্বাধীন বিচার বিভাগের প্রতিশ্রুতি দিলেও বর্তমানে সেই প্রতিশ্রুতির বিপরীত পথে এগোচ্ছে।
কুরআন ও সুন্নাহর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক একটি আইন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ বিষয়ে তাঁদের আপত্তি ও বৈষম্যের বিষয়গুলো কুরআনের আয়াত ও হাদিসের আলোকে তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান।
তিনি প্রস্তাব দেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে বিষয়টি পর্যালোচনার দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ আলেম ও কুরআন-হাদিসের পণ্ডিতদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে আইন প্রণয়নের কথাও বলেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেন, ইংরেজ আমলেও এমন উদ্যোগ নেওয়ার ‘দুঃসাহস’ দেখা যায়নি। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বাংলাদেশ আমলেও এ ধরনের চেষ্টা সফল হয়নি বলে দাবি করেন জামায়াত আমির।
মতবিনিময় সভায় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, বিরোধী দলের সংসদ সদস্য এবং ১১ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।







