দীর্ঘদিনের লোকসান, উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাস, পুরোনো যন্ত্রপাতি এবং উচ্চ উৎপাদন ব্যয়ের কারণে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চিনি শিল্প বর্তমানে নানা সংকটে রয়েছে। দেশের বেশ কয়েকটি চিনিকল বছরের পর বছর লোকসান গুনছে। কোথাও উৎপাদন বন্ধ, আবার কোথাও সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চলছে। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় চিনি শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন করে কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে পাকিস্তানের একটি বিশেষজ্ঞ কারিগরি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে দেশের বিভিন্ন চিনিকলের বর্তমান অবস্থা, উৎপাদন সক্ষমতা, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোগত সমস্যা পর্যালোচনা করবে। পরিদর্শনের মাধ্যমে কোন কারখানায় কী ধরনের সংস্কার, আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে পুরোনো চিনিকলগুলোকে আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে দেশে চিনি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় খাতের দীর্ঘদিনের লোকসানও কমানো যেতে পারে।
পুরোনো অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবে পাকিস্তান
এই সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা রয়েছে পাকিস্তানের হেভি মেকানিক্যাল কমপ্লেক্স (এইচএমসি), টেক্সিলার। প্রতিষ্ঠানটি অতীতে বাংলাদেশের নাটোর ও পাবনায় চিনিকল স্থাপনে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিয়েছিল। এবার সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চিনি শিল্পের আধুনিকায়নে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হবে দেশের চিনিকলগুলোর কারিগরি সক্ষমতা যাচাই করা, পুরোনো যন্ত্রপাতির অবস্থা পর্যালোচনা করা এবং প্রয়োজনীয় আধুনিক প্রযুক্তি ও সংস্কারের সম্ভাব্য পরিকল্পনা তৈরি করা। কোন কারখানাকে কতটা বিনিয়োগের মাধ্যমে পুনরায় কার্যকর করা সম্ভব এবং কোথায় নতুন প্রযুক্তি সংযোজন প্রয়োজন—এসব বিষয়েও তারা সুপারিশ করতে পারে।
ফলে উদ্যোগটি শুধু পুরোনো যন্ত্রপাতি মেরামতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে চিনিকলগুলোর সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের পরিকল্পনায় রূপ নিতে পারে।
চিনি উৎপাদনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও বায়ো-ইথানল
চিনি শিল্পকে লাভজনক করতে চিনিকলগুলোকে শুধু চিনি উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বহুমুখী উৎপাদন ব্যবস্থায় নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রস্তাবিত সহযোগিতার আওতায় চিনি উৎপাদনের পাশাপাশি আখের উপজাত ব্যবহার করে বিদ্যুৎ, বায়ো-ইথানল এবং মানসম্পন্ন জৈব সার উৎপাদনের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে।
আখ প্রক্রিয়াজাত করার পর অবশিষ্ট উপজাত যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে অতিরিক্ত আয়ের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ের একটি অংশও পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হলে কারখানার নিজস্ব জ্বালানি চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
তবে এসব ব্যবস্থা বাস্তবায়নে আধুনিক প্রযুক্তি, বড় ধরনের বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনবল প্রয়োজন হবে।
২০২০ সালে ছয় চিনিকলে উৎপাদন বন্ধ
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চিনি শিল্পের সংকট দীর্ঘদিনের। উৎপাদন কমে যাওয়া ও বড় অঙ্কের লোকসানের কারণে ২০২০ সালে দেশের ছয়টি চিনিকলে উৎপাদন স্থগিত করা হয়। এরপর থেকেই বন্ধ কারখানাগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।
এখন আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে পুরোনো কারখানাগুলো পুনরায় চালুর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে বন্ধ চিনিকল পুনরায় চালু করা কেবল নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে পর্যাপ্ত আখ সরবরাহ, কৃষকদের উৎপাদনে উৎসাহিত করা, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, উৎপাদন ব্যয়, বাজারজাতকরণ এবং শ্রমিক ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ও জড়িত।
শুধু কারখানা সংস্কারেই সমাধান নয়
রাষ্ট্রীয় চিনিকলগুলোর দীর্ঘদিনের লোকসানের পেছনে পুরোনো প্রযুক্তি ও কম উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি আরও কয়েকটি কারণ রয়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে অনেক কারখানার যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা কমে গেছে। একই সঙ্গে আখের মান ও সরবরাহ, চিনি উৎপাদনের উচ্চ ব্যয় এবং আমদানিকৃত চিনির সঙ্গে বাজার প্রতিযোগিতাও বড় চ্যালেঞ্জ।
তাই শুধু কারখানা সংস্কার করলেই রাষ্ট্রীয় চিনি শিল্প লাভজনক হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি দক্ষ ব্যবস্থাপনা, কৃষকদের জন্য কার্যকর প্রণোদনা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং উৎপাদিত চিনি ও উপজাতের বাজার নিশ্চিত করাও জরুরি।
পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলের কারিগরি সমীক্ষায় এসব সমস্যার বাস্তব চিত্র উঠে এলে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও আধুনিকায়ন পরিকল্পনা আরও কার্যকরভাবে তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
ব্যয় বহন করবে পাকিস্তান
বাংলাদেশ সফরকারী পাকিস্তানি কারিগরি প্রতিনিধি দলের যাতায়াত ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের ব্যয় পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বহন করার কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে চিনি শিল্পে এই সহযোগিতা নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে কারিগরি মূল্যায়নের পর কী ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে, কোন চিনিকলগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের অর্থ কোথা থেকে আসবে—এসব বিষয়ে পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আমদানিনির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা
বাংলাদেশের চিনি চাহিদার বড় একটি অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হলে দেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়ে।
রাষ্ট্রীয় চিনিকলগুলো আধুনিকায়নের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়াতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে চিনি আমদানির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আখ চাষ বাড়লে কৃষকরাও নতুন বাজার পাবেন।
তবে এ ক্ষেত্রে কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং চিনিকল ও আখচাষিদের মধ্যে কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের চিনি শিল্প পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ সম্ভাবনাময় হলেও এর বাস্তবায়ন সহজ হবে না। পুরোনো অবকাঠামো সংস্কার, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং নিয়মিত কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে উৎপাদিত চিনি ও অন্যান্য উপজাতের বাজার নিশ্চিত না হলে আধুনিকায়িত কারখানাও প্রত্যাশিত মুনাফা দিতে ব্যর্থ হতে পারে। তাই পাকিস্তানের কারিগরি সহযোগিতাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি বাংলাদেশকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ ও বাজার ব্যবস্থাপনাও শক্তিশালী করতে হবে।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা গেলে এ উদ্যোগ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চিনি শিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। আধুনিক প্রযুক্তি, বহুমুখী উৎপাদন এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ঘটাতে পারলে দীর্ঘদিনের লোকসানি চিনিকলগুলো ধীরে ধীরে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এর পাশাপাশি দেশে চিনি উৎপাদন বাড়লে আমদানিনির্ভরতা কমানো, কৃষকদের আখ চাষে উৎসাহিত করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে কারিগরি সমীক্ষা, বিনিয়োগ, আধুনিকায়ন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ও দক্ষতার ওপর।
