বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং সামগ্রিক সমাজের আত্মসমালোচনা ও আত্ম-অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপরাষ্ট্রদূত জন এফ ড্যানিলোভিচ।
তিনি বলেন, এ আত্মসমালোচনার আওতা থেকে বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগও বাদ যায় না। সাম্প্রতিক ও নিকট অতীতের ইতিহাসে নিজেদের ভূমিকার বিষয়েও দলটির হিসাব-নিকাশ করা প্রয়োজন।
শুক্রবার সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের ‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে এসব কথা বলেন ড্যানিলোভিচ। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)।
আবদুর রাজ্জাকের বইটিকে বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে উল্লেখ করেন সাবেক এই মার্কিন কূটনীতিক। তাঁর মতে, বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামীকে বোঝার চেষ্টা করছেন এমন গবেষক, কূটনীতিক ও অন্যদের জন্য বইটি ইতিহাস ও রাজনৈতিক চিন্তাধারা বোঝার একটি মূল্যবান উৎস হতে পারে।
ড্যানিলোভিচ বলেন, বইটি প্রকাশের আগেই অনেকে এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে নিজেদের ধারণা তৈরি করে ফেলেছিলেন। এমনকি বইটি নিয়ে মন্তব্য করা কয়েকজন সেটি পড়েননি বলেও তাঁর ধারণা।
তিনি বলেন, “সবার প্রতি আমার প্রথম অনুরোধ, বইটি সত্যিই পড়ুন, এটি নিয়ে চিন্তা করুন। এরপর আলোচনা করুন। এই আলোচনা শুধু জামায়াতে ইসলামীর সদস্যদের জন্য নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।”
ড্যানিলোভিচের ভাষ্য, জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে যেমন আত্মসমালোচনা ও আত্ম-অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং সামগ্রিক সমাজের মধ্যেও একই ধরনের আত্মমূল্যায়ন দরকার। এর মধ্যে আওয়ামী লীগও রয়েছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ও নিকট অতীতের ইতিহাসে নিজেদের ভূমিকার সঙ্গে দলটিরও হিসাব মেলানো প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
আবদুর রাজ্জাককে বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করে ড্যানিলোভিচ বলেন, কূটনীতিক হিসেবে তাঁর দুটি প্রধান দায়িত্ব ছিল। প্রথমটি ছিল যে সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন, সেই সরকারের অবস্থান সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও জনগণের কাছে তুলে ধরা। দ্বিতীয়টি ছিল যে দেশে দায়িত্ব পালন করছেন, সেই দেশকে বোঝা।
বাংলাদেশকে বোঝার জন্য বিভিন্ন পটভূমি ও দৃষ্টিভঙ্গির মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে আবদুর রাজ্জাকসহ অনেক বন্ধুর কাছে তাঁর পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে গভীরভাবে ঋণী তিনি।
ড্যানিলোভিচ আরও বলেন, আবদুর রাজ্জাক শুধু বাংলাদেশকে বুঝতে তাঁকে সহায়তা করেননি; বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, আইনজীবী সমাজ এবং তিনি যে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করতেন, সেই জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কেও তাঁকে জানার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।
বছরের পর বছর আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল উল্লেখ করে ড্যানিলোভিচ বলেন, কূটনৈতিক দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও তাঁদের সম্পর্ক অব্যাহত ছিল। তবে দুজনই নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন ছিলেন—তিনি ছিলেন মার্কিন সরকারের প্রতিনিধি, আর রাজ্জাক ছিলেন তাঁর রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি।
আবদুর রাজ্জাকের বইটির সততা ও অকপটতাকে এর অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরেন ড্যানিলোভিচ। তাঁর মতে, বইটিতে অতীতের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়েও খোলামেলা আলোচনা রয়েছে।
বাংলাদেশ নিয়ে লেখা অন্যান্য বইয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরে ড্যানিলোভিচ বলেন, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মওদুদ আহমদের বই থেকেও তিনি অনেক কিছু শিখেছেন। আবার এমন কিছু বইও পড়েছেন, যেগুলোর বিষয়বস্তু পরবর্তী সময়ে তাঁর মনে থাকেনি। কিছু বইয়ে লেখকের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা এজেন্ডাও স্পষ্ট ছিল।
আবদুর রাজ্জাকের বইটি সম্পর্কে ড্যানিলোভিচ বলেন, এটি পড়ে তাঁর সবচেয়ে ভালো লেগেছে যে রাজ্জাক বরাবরের মতো একজন দক্ষ পেশাজীবীর পরিচয় দিয়েছেন। নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি সেগুলোকে যথাযথ প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে বৃহত্তর বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন তিনি।
