সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী স্কলার, গবেষক ও ফকিহ প্রফেসর ড. আল্লামা ইউসুফ আবদুল্লাহ আল-কারযাভী রহ.-এর জীবন ও অনন্য অবদান বিশ্বজুড়ে এক গভীর ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। ১৯২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মিশরের নীল নদ অববাহিকার এক গ্রামে জন্ম নেওয়া এই ক্ষণজন্মা মনীষী ২০২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ৯৬ বছর বয়সে কাতারের দোহায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালের মাধ্যমে আধুনিক ইসলামি চিন্তাধারা ও জ্ঞানের এক সমৃদ্ধ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
কায়রোর ঐতিহ্যবাহী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে শায়খ কারযাভীর ইলমি পথচলা শুরু হয়েছিল। তারুণ্যেই তিনি মিশরের জনপ্রিয় সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠন ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর সংস্পর্শে আসেন এবং হাসান আল-বান্নার আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। ইসলামী জীবনবিধানের এই বাস্তবমুখী দর্শনে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তৎকালীন মিশরীয় সরকারের তীব্র রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হতে হয় তাঁকে এবং ১৯৪০ ও ৫০-এর দশকে একাধিকবার কারাবরণসহ নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়।
কারাগারের চরম নির্যাতনের ভেতরেও তিনি উগ্র পন্থার বিরোধী অবস্থান নেন এবং চরমপন্থার বিরুদ্ধে একাধিক জ্ঞানগর্ভ বই রচনা করেন। ১৯৬১ সালে মিশরীয় সরকারের নির্যাতন এড়াতে তিনি কাতারে হিজরত করেন। সেখানে তৎকালীন কিউবেকের আমির তাঁকে সম্মানজনক নাগরিকত্ব প্রদান করেন এবং তিনি সেখান থেকেই তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক ও গবেষণামূলক লেখালেখির পরিধি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেন।
আল-আজহারের তত্ত্বাবধানে রচিত ‘আল-হালাল ওয়াল হারাম ফিল ইসলাম’সহ জীবনের শেষভাগে ৫০ খণ্ডের বিশাল বিশ্বকোষ নির্মাণসহ একশরও বেশি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন এই যুগশ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ। ১৯৯৬ সালে আল জাজিরা টেলিভিশনে শুরু হওয়া তাঁর সাপ্তাহিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান ‘আল-শারিয়া ওয়া আল-হায়াহ’ (শরিয়াহ ও জীবন)-এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছান এবং ‘গ্লোবাল মুফতি’ বা বৈশ্বিক আইনজ্ঞ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলার্স’ এবং ‘ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর ফাতওয়া অ্যান্ড রিসার্চ’-এর মতো প্রভাবশালী বহুজাতিক ইসলামি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।
ড. কারযাভী সমসাময়িক রাজনীতি, মানবাধিকার এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে অত্যন্ত সাহসী ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে ২০১১ সালের ‘আরব বসন্ত’-এর সময় স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ও মুক্তির সংগ্রামে তাঁর সুস্পষ্ট সমর্থন বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি আগ্রাসন ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন অবস্থান সবসময় বিশ্ব মিডিয়ায় স্থান করে নিয়েছে।
জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি আধুনিক সমাজের উপযোগী ভারসাম্যপূর্ণ (ওয়াসাতিয়্যাহ) বা মধ্যপন্থী ইসলামি চিন্তাধারা প্রচারের জন্য তিনি সমাদৃত ছিলেন। শতাব্দীর সেরা এই স্কলার কেবল জ্ঞানের জগতেই নয়, ইসলামি জীবনবিধান ও সাম্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এক দীপ্তিমান পথিকৃৎ হয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে বেঁচে থাকবেন।
