সম্প্রতি বাংলাদেশে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে হেবা বা গিফটের ক্ষেত্রে নতুন আইনি ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তি সম্পত্তির মালিকানা অন্যের কাছে হস্তান্তর করার পরও জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগের অধিকার নিজের কাছে রাখতে পারবেন।
বিষয়টি শুধু সম্পত্তি আইনের পরিবর্তন নয়; মুসলিমদের জন্য এর সঙ্গে হেবা, কবজা, মালিকানা ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ শরিয়াহ প্রশ্নও জড়িত।
২০২৬ সালে সংসদে পাস হওয়া Transfer of Property (Amendment) Act, 2026-এর মাধ্যমে ১৮৮২ সালের Transfer of Property Act-এ নতুন Section 122A ও Section 122B সংযোজন করা হয়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সরকারি গেজেটে আইনটি প্রকাশিত হয়।
নতুন আইনে কী পরিবর্তন হয়েছে?
নতুন বিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে—যেমন বাবা-মা ও সন্তান, দাদা-দাদি বা নানা-নানি ও নাতি-নাতনি এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে—এমনভাবে সম্পত্তি হস্তান্তর করা যাবে, যাতে মালিকানা গ্রহীতার কাছে চলে গেলেও দাতা জীবদ্দশায় সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগের অধিকার ধরে রাখতে পারেন।
এমনকি দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় গ্রহীতা মারা গেলেও সম্পত্তি আইন অনুযায়ী গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে যেতে পারে। তবে দাতার জীবদ্দশায় ভোগের অধিকার বহাল থাকবে।
আইনে এ ধরনের হেবা নিবন্ধনের পর সাধারণভাবে তা অপরিবর্তনীয় রাখার বিধান করা হয়েছে। তবে পারস্পরিক সম্মতি, বিশেষ প্রয়োজন এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদনের মাধ্যমে পরিবর্তন বা বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে।
আইনটির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—সন্তানের কাছে সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও যেন তারা জীবদ্দশায় বসবাস ও ব্যবহারের অধিকার হারিয়ে না ফেলেন।
শরিয়াহর দৃষ্টিতে মূল প্রশ্ন কোথায়?
ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী জীবদ্দশায় সন্তানকে সম্পত্তি হেবা করা মূলত বৈধ। তবে প্রশ্ন হলো—হেবা করার পর মালিকানা গ্রহীতার কাছে গেলেও যদি সম্পত্তির ব্যবহার, ভোগ ও নিয়ন্ত্রণ দাতার কাছেই থাকে, তাহলে শরিয়াহর দৃষ্টিতে গ্রহীতার কবজা বা পূর্ণ মালিকানা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে?
ইসলামি ফিকহে হেবার ক্ষেত্রে কবজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ফকিহের মতে, শুধু হেবা-চুক্তি সম্পন্ন করাই যথেষ্ট নয়; গ্রহীতার কবজা প্রতিষ্ঠিত হলে হেবা পূর্ণতা লাভ করে।
আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমির অবস্থান
ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফিকহ একাডেমির Resolution No. 53 (4/6), “Qabd (Taking Possession): Forms and their Rulings”-এ কবজা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, কবজা শুধু কোনো সম্পত্তি শারীরিকভাবে হাতে নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; কবজা হুকমি বা constructive possession-ও হতে পারে। তবে এর জন্য সম্পত্তি গ্রহীতার নিয়ন্ত্রণে দেওয়া এবং তাকে সেটির ওপর কার্যকরভাবে লেনদেন করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ, শুধু কাগজে মালিকানা সৃষ্টি করলেই কবজা সম্পন্ন হয়েছে—এমনটি সব ক্ষেত্রে বলা যায় না। গ্রহীতার সম্পত্তির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
এখানেই নতুন আইনের সঙ্গে ফিকহি প্রশ্ন তৈরি হয়। উদাহরণ হিসেবে, কোনো বাবা সন্তানকে নিজের বাড়ি হেবা করলেন, কিন্তু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজেই বাড়িতে বসবাস, ব্যবহার ও ভোগের অধিকার রাখলেন। একই সঙ্গে সন্তানের স্বাধীন ব্যবহারও সীমিত থাকল।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, সন্তান কি এমন কবজা পেয়েছেন, যার মাধ্যমে তিনি সম্পত্তির ওপর পূর্ণ মালিকানা প্রয়োগ করতে পারেন?
এএওআইএফআইয়ের শরিয়াহ স্ট্যান্ডার্ড
অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড অডিটিং অর্গানাইজেশন ফর ইসলামিক ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন্সের (এএওআইএফআই) Shariah Standard No. 18: Possession (Qabd)-এও স্থাবর সম্পত্তির কবজা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা রয়েছে।
সেখানে স্থাবর সম্পত্তির কবজার ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী মালিকের পক্ষ থেকে সম্পত্তি ছেড়ে দেওয়া এবং নতুন মালিককে সম্পত্তির ওপর লেনদেনের সক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশের নতুন আইনের ক্ষেত্রে একদিকে গ্রহীতার কাছে মালিকানা হস্তান্তর হচ্ছে, অন্যদিকে দাতা জীবদ্দশায় সম্পত্তির ব্যবহার ও ভোগের অধিকার ধরে রাখছেন। ফলে দাতা যদি সম্পত্তির দখল ও ব্যবহার নিজের কাছেই রাখেন এবং গ্রহীতা স্বাধীনভাবে সম্পত্তির ওপর লেনদেন করতে না পারেন, তাহলে কবজা প্রতিষ্ঠার শরিয়াহ মানদণ্ড কীভাবে পূরণ হবে—এ প্রশ্ন সামনে আসে।
তাহলে কি নতুন আইন সম্পূর্ণ শরিয়াহবিরোধী?
বিষয়টি এত সরলভাবে দেখার সুযোগ নেই।
মিসরের দারুল ইফতা ১০ নভেম্বর ২০২০ তারিখে নাসের সোশ্যাল ব্যাংকের একটি শর্তযুক্ত হেবা ব্যবস্থা নিয়ে ফতোয়া নম্বর ৫১২৬ প্রকাশ করে। সেখানে এমন একটি ব্যবস্থার কথা ছিল, যেখানে বাবা সন্তানকে সম্পদ হেবা করবেন; তবে বাবা জীবিত থাকা পর্যন্ত সন্তান সম্পত্তির ওপর স্বাধীনভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না এবং বাবা কিছু অধিকার ব্যবহার করবেন।
দারুল ইফতা এ ধরনের শর্তযুক্ত হেবাকে জায়েজ বলেছে। একই সঙ্গে তারা হেবা-চুক্তি এবং কবজা ও পূর্ণ মালিকানা প্রতিষ্ঠার বিষয়কে পৃথকভাবে বিবেচনা করেছে।
তাদের ব্যাখ্যায়, হেবা-চুক্তি সম্পন্ন হতে পারে; কিন্তু দাতার অনুমতির ওপর কবজা ও হস্তান্তর নির্ভর করতে পারে। এমনকি ‘গ্রহীতার হাতকে সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ থেকে বন্ধ রাখা’র পরিবর্তে দাতার জীবদ্দশায় হস্তান্তর ও কবজা বিলম্বিত রাখার ভাষা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের আইনের সঙ্গে পার্থক্য কোথায়?
দাতার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কিছু অধিকার নিজের কাছে রাখার ধারণাকে দারুল ইফতা সরাসরি অগ্রহণযোগ্য বলেনি। বরং তারা বিষয়টিকে হেবা, তাসলিম ও কবজার ফিকহি কাঠামোর মধ্যে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
তাই বাংলাদেশের নতুন আইনে মালিকানা হস্তান্তর, দাতার ভোগের অধিকার এবং গ্রহীতার কবজার বিষয়গুলো শরিয়াহর আলোকে কীভাবে সমন্বিত হবে—এটি গভীর গবেষণার দাবি রাখে।
দেশের বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে গবেষণা করে এ বিষয়ে সুচিন্তিত মতামত দেবেন—এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: গবেষক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক
