রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলোচনায় এসেছেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। ঘটনার পর তার নাম সামনে আসার পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও শুরু হয় নানা আলোচনা। এরই মধ্যে ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয় তাকে। পরে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি।
তবে মিরপুরের স্থানীয় রাজনীতিতে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি নতুন কোনো নাম নন। সাবেক কাউন্সিলর, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নেত্রী এবং প্রয়াত বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বোন হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই তার রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে।
স্থানীয় রাজনীতি থেকে সংসদ সদস্য
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৬ সালে বিএনপির মনোনয়নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন-২৩ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
এর আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন মিষ্টি। ২০০২ সালে তার স্বামী সাইদুর রহমান নিউটন নিহত হওয়ার পর তিনি ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান ধরে রাখেন। ২০১৯ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও ৮ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি।
পিন্টুর বোন, নিউটনের স্ত্রী
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পারিবারিক পরিচয়ের সঙ্গে বিএনপির রাজনীতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তিনি প্রয়াত বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বোন। তার স্বামী সাইদুর রহমান নিউটনও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
স্বামীর মৃত্যুর পর কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে মিষ্টির পরিচিতি আরও বিস্তৃত হয়। তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু আরও আগে। বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে কলেজ ছাত্র সংসদের সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) নির্বাচিত হন।
সমমনা সমিতির সঙ্গে পুরোনো সম্পর্ক
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার পর ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই সমিতির সঙ্গে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির অতীতে সংশ্লিষ্টতা ছিল।
জানা যায়, ২০০৬ সালে শাহআলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকাকালে তিনি সমিতিটির সভাপতি ছিলেন। এর আগে ২০০৪ সালে রাড্ডা সেন্টারের জমি সমিতির নামে বরাদ্দ চেয়ে করা আবেদনের নথিতেও সভাপতি হিসেবে তার নাম উল্লেখ ছিল।
সম্প্রতি গণমাধ্যমের কাছে মিষ্টি সমিতিটির সাবেক সভাপতি থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। জমি বরাদ্দের জন্য আবেদন করার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তবে বর্তমানে সমিতির সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছেন। একই সঙ্গে রাড্ডা সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় নিজের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
রাড্ডা সেন্টারে কী ঘটেছিল
গত ২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে রাজধানীর মিরপুর-১ এলাকায় রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও ভাঙার সরঞ্জাম নিয়ে সেখানে প্রবেশ করেন। পরে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবনসহ স্থাপনাটি ভেঙে ফেলা হয়।
ঘটনার পর ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নামও আলোচনায় আসে। তবে হামলা ও ভাঙচুরে তার সরাসরি ভূমিকা ছিল কি না, তা নিয়ে তদন্ত চলছিল বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
৩০ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, রাড্ডা সেন্টার ভাঙচুরের ঘটনায় মিষ্টির সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্তাধীন। অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
পাঁচ মাসের মাথায় সংসদ সদস্য পদত্যাগ
সংরক্ষিত নারী আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই পদত্যাগের ঘটনায় ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি আবারও জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় আসেন।
১ অক্টোবর তাকে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং নিশ্চিত করে। পরে তিনি জাতীয় সংসদে গিয়ে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
তার পদত্যাগের ঘটনা রাড্ডা সেন্টার নিয়ে চলমান তদন্ত ও রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে পদত্যাগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওঠা রাজনৈতিক আলোচনা এবং রাড্ডা সেন্টারে হামলার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ—দুটি বিষয়কে পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তদন্তের ফলের অপেক্ষা
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির রাজনৈতিক পরিচয় স্থানীয় বিএনপির রাজনীতি, সাবেক কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং তার পারিবারিক রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে, রাড্ডা সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
তাই সমিতির সঙ্গে তার অতীত সম্পর্ক, জমি বরাদ্দের আবেদন এবং হামলার ঘটনায় তার কথিত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা স্পষ্ট হলেই এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।
