ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে প্রেমিক আকাশ মিত্রের মরদেহ দেখতে গিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন নার্স তন্ময়ী মণ্ডল। এর কয়েক ঘণ্টা পরই ঢামেক হাসপাতালের পুরোনো ভবনের নিচতলার একটি টয়লেট থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিকভাবে তন্ময়ী আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন বলে ধারণা করছে পুলিশ। তবে ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড কি না, কিংবা মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তের অন্যান্য তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ।
ঘটনার সূত্রপাত রোববার (৪ অক্টোবর) বিকেলে কেরানীগঞ্জে। ওইদিন কেরানীগঞ্জের একটি বাসা থেকে আকাশ মিত্রের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে আনা হয়।
তন্ময়ী মণ্ডলের সঙ্গে আকাশ মিত্রের সম্পর্ক ছিল বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। আকাশের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেক মর্গে আনার খবর পেয়ে তন্ময়ী সেখানে যান।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মর্গে প্রেমিকের মরদেহ দেখার পর তন্ময়ী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এরপর হাসপাতালের ভেতরে তিনি নিজেকে আহত করেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
পরে তিনি ঢামেক হাসপাতালের পুরোনো ভবনের নিচতলার একটি টয়লেটে যান। সেখান থেকেই সোমবার সকালে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম জানান, তন্ময়ী ও আকাশ মিত্রের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার একটি প্রাথমিক চিত্র পাওয়া গেছে।
তার ভাষ্য, আকাশের মৃত্যুর পর ঢামেক মর্গে তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ওই সময় তন্ময়ী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। প্রেমিকের মরদেহ দেখার পর তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন বলে পরিবারের কাছ থেকে জানা গেছে।
তবে পুলিশ কর্মকর্তা স্পষ্ট করেছেন, এটি এখনো প্রাথমিক তদন্তের তথ্য। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণের পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এদিকে আকাশ মিত্রের মৃত্যুকে ঘিরেও আর্থিক সংকটের বিষয়টি সামনে এসেছে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, আর্থিক সংকট ও ঋণের কারণে আকাশ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
মৃত্যুর আগে আকাশ একটি চিঠি লিখেছিলেন বলেও পুলিশ জানিয়েছে। সেখানে তিনি টাকা-পয়সার সংকটের কথা উল্লেখ করেছিলেন। চিঠিতে তন্ময়ী তার কাছে টাকা পাবেন বলেও লেখা ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে কী পরিমাণ টাকা পাওনা ছিল, সে বিষয়ে পুলিশ নিশ্চিত নয়।
ওই চিঠিতে আকাশের মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করা হয়নি বলেও জানিয়েছেন এসআই রফিকুল ইসলাম।
অন্যদিকে তন্ময়ীর পরিবারের পক্ষ থেকে আকাশের বিরুদ্ধে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। তন্ময়ীর বোন তন্দ্রা মণ্ডল জানিয়েছেন, আকাশের সঙ্গে তন্ময়ীর সম্পর্ক ছিল এবং বিভিন্ন অজুহাতে আকাশ তার কাছ থেকে প্রায় দুই লাখ টাকা নিয়েছিলেন বলে তন্ময়ী তাকে জানিয়েছিলেন।
তন্দ্রার দাবি, ওই অর্থ তন্ময়ী কয়েকজনের কাছ থেকে সংগ্রহ করে আকাশকে দিয়েছিলেন। আকাশের সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেন এবং তাদের সম্পর্কের বিষয়টি তন্ময়ীর মৃত্যুর পেছনে কোনো ভূমিকা রেখেছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তন্ময়ীর বোন আরও জানান, রোববার বিকেলে আকাশের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তন্ময়ী ঢামেক হাসপাতালে যান। সেখানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করার পর তিনি হাসপাতালের টয়লেটে যান। পরে সেখান থেকেই তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সোমবার সকাল ১০টার দিকে ঢামেক হাসপাতালের পুরোনো ভবনের ১১০ ও ১১১ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝামাঝি নারীদের টয়লেটের ৪ নম্বর কক্ষ থেকে তন্ময়ীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মাহমুদ শেখ জানান, নিয়মিত পরিষ্কার করার জন্য তিনি সকাল ১০টার দিকে ওই টয়লেটে যান। ভেতরের কক্ষগুলোতে থাকা ব্যক্তিদের বের হওয়ার জন্য দরজায় ধাক্কা দেওয়ার সময় ৪ নম্বর কক্ষের দরজায় একাধিকবার ধাক্কা দিয়েও কোনো সাড়া পাননি।
বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে তিনি রাসেল ও কামাল নামে আরও দুই পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে ডাকেন। পরে তারা দেখতে পান, কক্ষটির দরজা ভেতর থেকে আটকানো।
দরজা খোলার পর তারা তন্ময়ীকে রক্তাক্ত ও ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান বলে জানান। এরপর বিষয়টি হাসপাতালের আনসার সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শাহবাগ থানায় খবর দেয়।
তন্ময়ীর মরদেহ উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা আগে হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্লকের সম্মেলন কক্ষের সামনে রক্তাক্ত একটি ছুরি পড়ে থাকতে দেখা যায়।
পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাশী পেল্লী সন্তোষ জানান, সোমবার ভোর আনুমানিক ৬টা থেকে সাড়ে ৬টার মধ্যে তিনি ওই ছুরিটি দেখতে পান। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে তিনি ঘটনাস্থলের মেঝে পরিষ্কার করেন এবং ছুরিটি নিজের কাছে রেখে দেন।
পরে তন্ময়ীর মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে তিনি জানতে পারেন, কয়েক ঘণ্টা আগে পাওয়া ছুরিটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. শায়লা ফেরদৌস আহসান জানান, সম্মেলন কক্ষের একটি গেটের বাইরে রক্তের দাগসহ একটি ছুরি পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। আশপাশেও ফোঁটা ফোঁটা রক্তের চিহ্ন ছিল।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথম দিকে বিষয়টিকে আলাদা কোনো অপরাধের আলামত হিসেবে নিশ্চিত হতে পারেনি। হাসপাতালে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী ও স্বজনের চলাচল থাকায় বিভিন্ন সময় মেঝেতে রক্ত পড়ে থাকে। এ কারণে প্রাথমিকভাবে বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।
পরে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা রাসায়নিক ব্যবহার করে ওই স্থান পরিষ্কার করেন এবং ছুরিটি সংরক্ষণ করেন।
তবে ঘটনাস্থল ও আশপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকায় ফুটেজ পর্যালোচনা করে ছুরিটি সেখানে কীভাবে এলো এবং তন্ময়ীর মৃত্যুর সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা বের করার চেষ্টা করছে পুলিশ।
তন্ময়ীর মরদেহ উদ্ধারের পরপরই ঘটনাটি নিয়ে হত্যাকাণ্ডের সন্দেহ তৈরি হয়। ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, রক্তের দাগ এবং ছুরির উপস্থিতির কারণে শুরুতে পুলিশও সব সম্ভাবনা সামনে রেখে তদন্ত শুরু করে।
রাত থেকেই হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা যায়। পাশাপাশি ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়।
পরে প্রাথমিক তদন্ত এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে আত্মহত্যার সম্ভাবনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানায় পুলিশ। তবে এখনো এটিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।
শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাহফুজা আক্তার জানান, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিকভাবে প্রেমঘটিত কারণে তন্ময়ী আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ছাড়া মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ঘটনাস্থলে সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিটও যায়। তারা প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করে।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে।
তন্ময়ীর ব্যাগের ভেতর থেকে একটি চিরকুটও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। সেখানে ‘তন্ময়ী মণ্ডল’ নাম লেখা ছিল। তবে চিরকুটটির বিষয়বস্তু এবং এর সঙ্গে মৃত্যুর ঘটনার কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, তন্ময়ীর পরিচয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি তার মৃত্যুর কারণও তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলের আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ, চিরকুট এবং পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
তন্ময়ী মণ্ডল ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি প্রায় এক মাস আগে সেখানে যোগ দেন।
তন্ময়ীর বাড়ি বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলায়। তার বোন তন্দ্রা মণ্ডল ঢামেক হাসপাতালের মর্গে এসে মরদেহ শনাক্ত করেন।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, তন্ময়ী তার এক বান্ধবীর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবহার করে একটি সিম কার্ড নিয়েছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। কেন তিনি অন্যের পরিচয়পত্র ব্যবহার করেছিলেন এবং এর সঙ্গে আকাশ মিত্র বা তার মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে।
পুলিশের কাছে এখন আকাশ মিত্রের মৃত্যুর ঘটনাটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আকাশ কীভাবে মারা গেলেন, তার মৃত্যুর আগে তার মানসিক ও আর্থিক পরিস্থিতি কী ছিল, তন্ময়ীর সঙ্গে তার কী ধরনের আর্থিক লেনদেন ছিল এবং আকাশের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তন্ময়ীর আচরণ কেমন ছিল—এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে আকাশের লেখা চিঠি, তন্ময়ীর পাওয়া চিরকুট, হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা আলামত বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, আকাশের মৃত্যুর পর তন্ময়ী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়ে থাকতে পারেন। তবে ঘটনাস্থলে রক্তের দাগ, ছুরি পাওয়া এবং অন্যান্য আলামতের কারণে সব সম্ভাবনা যাচাই করে দেখা হচ্ছে।
তন্ময়ীর মৃত্যু আত্মহত্যা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে—এখনো সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি পুলিশ।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর ধরন ও কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সিসিটিভি ফুটেজ ও ফরেনসিক আলামত বিশ্লেষণের ফলও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এসব তথ্যের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য এবং আকাশ মিত্রের মৃত্যুর ঘটনাকে মিলিয়ে দেখার পরই পুরো ঘটনার একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তন্ময়ী মণ্ডলের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্তভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের অন্যান্য তথ্য পাওয়ার পরই এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।
