প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন এক সময়ে এবং এমন একটি জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে সরকার পরিচালনার ম্যান্ডেট পেয়েছেন, যাদের প্রত্যাশা অত্যন্ত উচ্চ। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসন অপসারণের কারণে তাদের আত্মবিশ্বাসও তুঙ্গে। ফলে সামাজিক, প্রশাসনিক কিংবা রাজনৈতিক যেকোনো অব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে এই জনতা যেকোনো সময় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একসময় যে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে তীব্র করেছিল, এখন সেই মাধ্যমের প্রভাব সামাল দেওয়াই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বজুড়েই বর্তমানে অস্থির রাজনৈতিক সময় চলছে। বিভিন্ন দেশে দুর্নীতিবিরোধী ও সরকারবিরোধী বিক্ষোভে তরুণদের ভূমিকা সামনে এসেছে। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ছাত্র-আন্দোলন, শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলন, কেনিয়ার ২০২৪ সালের জেন-জি আন্দোলন এবং নেপালের ২০২৫ সালের সরকার পরিবর্তনের ঘটনাগুলো দেখিয়েছে—তরুণদের অসন্তোষ যখন সাধারণ মানুষের সমর্থনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা সরকারের ওপর বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এই অস্থির সময়েই ক্ষমতায় এসেছেন তারেক রহমান। ফলে দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই তিনি ক্ষমতার অবস্থানটির চ্যালেঞ্জ ও চাপ সম্পর্কে সচেতন হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
বর্তমান বিএনপি সরকারের জন্য তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবারও কিছুটা অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে। বিভিন্ন মহল থেকে নতুন নতুন রাজনৈতিক বয়ান সামনে আসছে।
একদিকে জামায়াতে ইসলামীকে এবং অন্যদিকে আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে এমন একটি রাজনৈতিক বয়ান তৈরি হচ্ছে, যেখানে বিএনপি থেকে উভয় দলকে সমদূরত্বে রাখার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। লেখকের আশঙ্কা, এই বয়ানের আড়ালে এক-এগারোর মতো আরেকটি রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
একটি রাজনৈতিক সংকট তৈরির জন্য সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে চরম বিরোধ সৃষ্টি করা কিংবা উভয় পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে গভীর শত্রুতার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন হতে পারে। সেই দিক থেকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থান নিয়েও বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ভিন্ন ধরনের হিসাব-নিকাশ তৈরি হচ্ছে বলে লেখক মনে করেন।
বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সরাসরি ক্ষমতায় ফিরে আসা কঠিন—এমনটাই লেখকের বিশ্লেষণ। তার মতে, বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি একত্রিত হয়ে এমন কোনো উদ্যোগ প্রতিহত করার চেষ্টা করবে। তাই আওয়ামী লীগ কিংবা তাদের সমর্থকেরা সরাসরি সেই পথে না গিয়ে ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক কৌশল নিতে পারে—যার পরিণতিতে ‘এক-এগারো ভার্সন টু’-এর মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাকেও লেখক এ ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক পুরোনো ধরনের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কৌশল বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নাগরিক সাংবাদিকতার যুগে উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতার স্বীকারোক্তিও পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
লেখকের মতে, জেন-জি প্রজন্মের ক্ষোভকে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সংগঠন রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে। এই প্রজন্মের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—ছোট কোনো অনলাইন প্রতিবাদ, ব্যঙ্গ বা ক্ষোভ খুব অল্প সময়ের মধ্যে বড় নাগরিক আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।
২০২৪ সালের বাংলাদেশসহ বিশ্বের সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্দোলন এ বাস্তবতার উদাহরণ দিয়েছে। ছোট ছোট ক্ষোভকে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক শক্তি দিয়ে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও তা দীর্ঘমেয়াদে জমতে জমতে বড় ধরনের আন্দোলনের রূপ নিতে পারে।
এ অবস্থায় সরকারের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো দলীয়করণ কমিয়ে মেধাভিত্তিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলীয়করণের বিরুদ্ধে এবং মেরিটোক্রেসির পক্ষে কথা বললেও লেখকের মতে, বাস্তবে তার প্রতিফলন এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় দেখা যাচ্ছে না।
লেখক অতীতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, এক-এগারোর সময় বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দলটির পক্ষে কার্যকরভাবে অবস্থান নেয়নি। এ থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান সরকারকে দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা ও মেধাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
চুয়েট ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পরিবর্তনের ঘটনাও লেখক দলীয়করণের প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও যদি ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ প্রাধান্য পায়, তাহলে মেধাভিত্তিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য কীভাবে বাস্তবায়িত হবে?
‘মেরিটোক্রেসি চালু হলে জামায়াত-শিবিরের লোকজন প্রশাসনে ঢুকে পড়বে’—এমন আশঙ্কাকেও লেখক রাজনৈতিক দলগুলোর একটি মানসিক দ্বিধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিনস অ্যাওয়ার্ডের উদাহরণ দিয়ে তিনি দাবি করেছেন, মেধাবীদের বড় অংশ কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নয়। ফলে কয়েকজনের রাজনৈতিক পরিচয়ের আশঙ্কায় বৃহত্তর সংখ্যক মেধাবীকে বঞ্চিত করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
লেখকের মতে, প্রশাসনে কর্মরত ব্যক্তিদের মধ্যে পেশাদারিত্ব ও ব্যক্তিস্বার্থ অনেক সময় রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কারও কারও রাজনৈতিক আনুগত্যও পরিবর্তিত হতে দেখা যায়। তাই দলীয়করণের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো শেষ পর্যন্ত খুব বেশি লাভবান না হয়ে বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে।
সবশেষে লেখক ‘এক-এগারো ভার্সন টু’ কীভাবে তৈরি হতে পারে, তার একটি সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর আশঙ্কা, তরুণদের ক্ষোভ যদি সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমে বাড়তে থাকে এবং সেই ক্ষোভকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করা হয়, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। একই সঙ্গে কোনো পর্যায়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনকে ‘গুপ্ত ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হলে সংকট আরও গভীর হতে পারে।
লেখক নিজেই স্বীকার করেছেন, তিনি কোনো গণক নন। তাঁর আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হওয়ার চেয়ে বরং তা ভুল প্রমাণিত হওয়াতেই তিনি বেশি খুশি হবেন।
শেষ পর্যন্ত তাঁর বক্তব্য—রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি কিংবা মতাদর্শের ঊর্ধ্বে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাঁর ভাষায়, ব্যক্তির চেয়ে দল বড় হলেও দলের চেয়ে দেশ বড়। সেই নীতির বাস্তব প্রতিফলন ঘটানোর সময় এসেছে।
