ন্যাটোতে অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি রাশিয়া, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা মিত্রতা গড়ে তুলে নিজস্ব বিশ্বিক প্রভাব বিস্তার করছে তুরস্ক। প্রেসিডেন্ট রেশেপ তাইয়িপ এরদোয়ানের নেতৃত্বে আঙ্কারা এখন আর শুধু পশ্চিমের অনুগামী নয়, বরং ভারসাম্যপূর্ণ এবং স্বতন্ত্র কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতি নিয়ে এগিয়ে চলেছে।
১৯৫২ সাল থেকে সামরিক জোট ন্যাটোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিশ্ব রাজনীতিকে এখন আর পূর্ব বনাম পশ্চিম—এই দুই ভাগে ভাগ করা সম্ভব নয় এবং তুরস্ককে কোনো এক পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করাও ঠিক হবে না।
ন্যাটোর সদস্য হয়েও রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক, কৌশলগত এবং বিশেষ করে জ্বালানি সম্পর্কিত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অব্যাহত রেখেছে দেশটি। ইউক্রেন সংকটের মধ্যেও কিয়েভ ও মস্কোর মধ্যে সফল মধ্যস্থতা করেছে আঙ্কারা। এর বাইরে মার্কিন বিরোধিতা সত্ত্বেও রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনে নিজের সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবাধ স্বাধীনতার বার্তা দিয়েছে তুরস্ক।
অন্যদিকে, ইউরেশিয়া অঞ্চলের বাণিজ্য ও পরিবহন করিডোরে নিজের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে চীনের অর্থনৈতিক প্রকল্পের সঙ্গে জোরালোভাবে যুক্ত হচ্ছে তুরস্ক। এতে দেশটির অর্থনীতিতে চীনা বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের নতুন দরজা উন্মোচিত হচ্ছে।
ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর আদলে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের বলয় শক্তিশালী করতে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে তুরস্ক। এতে যৌথ ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির অঙ্গীকার করা হয়েছে, যা কৌশলগতভাবে আঙ্কারাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম মূল কেন্দ্রে বসিয়েছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈষম্যমূলক নীতির সমালোচনায় এরদোয়ানের বহুল আলোচিত বক্তব্য—‘বিশ্ব পাঁচের চেয়ে বড়’ মূলত বিশ্বমঞ্চে বর্তমান ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তনেরই বার্তা দেয়। একপক্ষের ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজেদের স্বাধীন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতেই তুরস্ক এই বহুমুখী কূটনৈতিক নীতি বজায় রাখছে।
