দেশে চাঁদাবাজি, জমি দখল এবং নির্মাণাধীন ভবনে হামলার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ঢাকার কেরানীগঞ্জে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও মালামাল লুটের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, হামলাকারীরা তাদের কাছে ৪০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিল। অন্যদিকে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে চাঁদা না দেওয়ায় একাধিক ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা-কর্মীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। তবে পুলিশের বক্তব্য, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কেরানীগঞ্জে আবাসন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে হামলা ও লুট
ঢাকার কেরানীগঞ্জের আরশিনগর এলাকায় আফসানা হাউজিংয়ের কার্যালয়ে গত রোববার সকাল ১১টা ২৬ মিনিটের দিকে হামলার ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, প্রায় ৩০ জন যুবক দেশীয় অস্ত্র, রামদা ও লাঠিসোঁটা নিয়ে কার্যালয়ে প্রবেশ করছেন। তাঁরা দরজা ভাঙচুর করেন এবং পরে আসবাবপত্র, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন মালামাল ভেঙে একটি ছোট ট্রাকে তুলে নিয়ে যান।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক নাসিরের অভিযোগ, হামলাকারীরা ৪০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন। দাবি পূরণ না করায় তাঁরা হামলা চালিয়ে প্রায় এক কোটি টাকার মালামাল লুট করেন।
এ ঘটনায় পরদিন প্রতিষ্ঠানের মালিক সাজিব ব্যাপারী ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ভাড়াটে সন্ত্রাসী ও স্থানীয় একটি যুবক দলের সদস্যরা হামলার সঙ্গে জড়িত। ঘটনার পর থেকে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং কর্মীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
রূপনগরে চাঁদার কারণে থমকে আছে নির্মাণকাজ
রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর এলাকায় জমি ও ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া, শ্রমিকদের মারধর এবং ভয়ভীতি দেখানোর মতো ঘটনা ঘটছে।
এ ছাড়া মিরপুরে পরিচিত এক কনটেন্ট নির্মাতার স্টুডিও এবং একটি বেসরকারি ক্লিনিকে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। এসব ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে।
রূপনগরের এক প্লটের মালিক মোদাসসের হোসেন জানান, চার কাঠা জমিতে নিজের বাড়ি নির্মাণের জন্য চার মাস আগে পাইলিংয়ের কাজ শুরু করেন তিনি। এ সময় একটি দলের কয়েকজন সদস্য তাঁর কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এর পর থেকেই নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।
গ্রামে থাকা জমি বিক্রি করে ঢাকায় নিজের বাড়ি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন মোদাসসের। কিন্তু চাঁদা দাবির কারণে তিনি কাজ এগিয়ে নিতে পারছেন না। এ ঘটনায় পুলিশের কাছে কোনো অভিযোগ করেননি তিনি। তাঁর আশঙ্কা, অভিযোগ করেও হয়তো কোনো প্রতিকার পাওয়া যাবে না।
রূপনগরের সম্প্রসারিত আবাসিক এলাকাতেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। ড্যাফোডিল হোমস লিমিটেডের চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান জানান, তাঁদের একটি ১০ তলা ভবনের চার তলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। খননকাজ শুরুর সময় থেকেই চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল। একপর্যায়ে ১০ লাখ টাকা চাওয়া হয়। এ ছাড়া তাঁদের কর্মীদের মারধর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আবদুল মান্নানের ভাষ্য, বিভিন্ন সময়ে অন্তত চারবার নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে। বর্তমানে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী তিন বছরের মধ্যে ভবনটির নির্মাণ শেষ করার কথা। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারলে জরিমানার মুখেও পড়তে পারেন তাঁরা।
এ ঘটনায় মামলা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে আবদুল মান্নানের অভিযোগ, চাঁদাবাজদের সঙ্গে পুলিশ ও রাজনৈতিক দলের কিছু সদস্যের যোগসাজশ রয়েছে।
প্রায় ৫০টি স্থাপনায় চাঁদা দাবির অভিযোগ
সম্প্রসারিত রূপনগর আবাসিক এলাকার প্লট, ফ্ল্যাট ও বাড়ির মালিকদের কল্যাণ সমিতি গত রোববার সংবাদ সম্মেলন করে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে ধরে।
সমিতির দাবি, ওই এলাকার প্রায় ৫০টি প্লট ও ভবনের মালিকের কাছে চাঁদা চাওয়া হয়েছে। নির্মাণশ্রমিকদের হুমকি দেওয়া ও মারধরের ঘটনাও ঘটেছে। এসব কারণে অনেক স্থাপনার নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে রয়েছে।
সমিতির নেতাদের অভিযোগ, এসব ঘটনায় পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন বন্ধ করা যাচ্ছে না।
সমিতির সহসভাপতি মো. তৌহিদুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এলাকায় চাঁদাবাজি ও জমি দখলের ঘটনা বেড়েছে।
এ বিষয়ে রূপনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশের দাবি, অভিযোগ পেলে নেওয়া হচ্ছে ব্যবস্থা
ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার আখতার হোসেন পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করা হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজন অনুযায়ী মামলা করা হচ্ছে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে।
তবে ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, মামলা করার পরও তাঁরা সব সময় প্রত্যাশিত প্রতিকার পাচ্ছেন না। চাঁদাবাজি ও জমি দখলের কারণে একদিকে তাঁদের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে নিরাপত্তাহীনতাও বাড়ছে।
রাজনৈতিক প্রশ্রয় কি অপরাধ দমনের পথে বাধা?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মো. তৌহিদুল হকের মতে, অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং দলীয় প্রশ্রয় অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাঁর ব্যাখ্যা, কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসার পর দলের কিছু সদস্য অতীতে হওয়া ক্ষতি পুষিয়ে নিতে জমি দখল ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারেন।
তবে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের দল থেকে বহিষ্কার করলেই অপরাধ বন্ধ হবে, এমনটি মনে করেন না তিনি। তাঁর মতে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারের তথ্য উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, সরকার অপরাধীদের আশ্রয় দেয় না। তবে ক্ষমতাসীন দলের কিছু সদস্য অপরাধে জড়িত থাকতে পারেন—এ সম্ভাবনাও তিনি নাকচ করেননি।
তাঁর বক্তব্য, ক্ষমতাসীন দলের নাম ব্যবহার করে মানুষ যদি নিয়মিত হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এর দায় সরকারকেই নিতে হবে। বিষয়টি সম্পর্কে সরকার সচেতন বলেও জানান তিনি।
চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি
চাঁদাবাজি ও জমি দখলের অভিযোগে ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তা এবং কার্যকর প্রতিকার চাইছেন। অন্যদিকে পুলিশের দাবি, অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে মামলা ও তদন্তের কথা বলা হলেও নির্মাণকাজ বন্ধ থাকা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা এবং বিপুল পরিমাণ সম্পদ লুটের অভিযোগ পরিস্থিতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের কারণে সাধারণ মানুষ, জমির মালিক এবং ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এ পরিস্থিতিতে অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
