দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পারিবারিক ও সামাজিক সংকট, আর্থিক চাপ, চিকিৎসার উচ্চ ব্যয় এবং প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারসহ বিভিন্ন কারণে মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। সচেতনতা কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও সামাজিক কুসংস্কার, লোকলজ্জা, দক্ষ জনবলের অভাব এবং চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকেই প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন না।
জাতীয় জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের ১৮.৭ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ১২.৬ শতাংশ মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। তবে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২.৩ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ৯৪.৫ শতাংশ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) এক গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের প্রায় অর্ধেকের মধ্যে অন্তত একটি মানসিক রোগ রয়েছে। ক্যানসার বিভাগে ভর্তি রোগীদের ক্ষেত্রে এ হার ৮৮.২৪ শতাংশ।
এমন প্রেক্ষাপটে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য—‘জীবনের কথা শুনি, বাস্তব পরিবর্তন আনি’। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে নীতিনির্ধারণ এবং চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থায় তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর এবার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের প্রায় অর্ধেকের মানসিক রোগ
বিএমইউর ৩৪২ জন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, তাঁদের ৪৮.৫৪ শতাংশের মধ্যে অন্তত একটি মানসিক রোগ রয়েছে। বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে ক্যানসার বিভাগে ভর্তি রোগীদের ৮৮.২৪ শতাংশ, মেডিসিন বিভাগে ৫১.৬৪ শতাংশ, সার্জারি বিভাগে ৩৮.৭৫ শতাংশ এবং স্নায়ুরোগ বিভাগে ৩১.২৫ শতাংশের মধ্যে মানসিক রোগ শনাক্ত হয়েছে। অথচ মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠানো হয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ রোগীকে।
বিএমইউর মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এমএমএ সালাউদ্দিন কাউসার বিপ্লবের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। চলতি বছরের ৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাময়িকী হেলথ সায়েন্স রিপোর্টস-এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।
অধ্যাপক সালাউদ্দিন কাউসার বিপ্লব আমার দেশকে বলেন, দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ব্যাপকতা উদ্বেগজনক। ক্যানসার ও মেডিসিন বিভাগে ভর্তি রোগীদের বিষণ্ণতা দেখা দিলেও অনেক ক্ষেত্রে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানোর পরিবর্তে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়। অথচ ঘুমের ওষুধ মানসিক রোগের মূল চিকিৎসা নয়।
তিনি আরও বলেন, যেসব হাসপাতালে মনোরোগবিদ্যা বিভাগ রয়েছে, সেখানেও অন্য বিভাগের চিকিৎসকদের মধ্যে মানসিক সমস্যাকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। অনেক হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থাও নেই। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলা জরুরি।
শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে উদ্বেগজনিত রোগের হার ৮.৯ শতাংশ এবং বিষণ্ণতার হার ৬.৭ শতাংশ। এ ছাড়া সোমাটিক সিমটম ডিজঅর্ডার, অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডার (ওসিডি), বাইপোলার ডিজঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া ও মাদকাসক্তির মতো সমস্যাও রয়েছে।
শিশু-কিশোরদের মধ্যেও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার চিত্র উদ্বেগজনক। তাদের মধ্যে ৫.১ শতাংশ নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার, ৪.৭ শতাংশ উদ্বেগজনিত রোগ এবং ১.৭ শতাংশ কনডাক্ট ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত।
১২ থেকে ১৭ বছর বয়সিদের মধ্যে মাদক গ্রহণের হার দেড় শতাংশ। অন্যদিকে, ৭ থেকে ১১ বছর বয়সিদের ক্ষেত্রে এ হার ০.২ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সেবার ঘাটতি
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ব্যাপকতার তুলনায় দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা ৩৮০ জন, মনোবিজ্ঞানী ৬০০ জন এবং মনোরোগ বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সমাজকর্মী মাত্র ১০ জন। প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন ০.১৯ জন এবং মনোবিজ্ঞানী ০.৩০ জন।
এ ছাড়া মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাধারণ চিকিৎসক রয়েছেন ২১ হাজার ২৬৭ জন, স্বাস্থ্যকর্মী ৯ হাজার ৪০০ জন এবং নার্স ২৮ হাজার ১৬৫ জন। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশিক্ষিত জনবলকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করা জরুরি।
দেশে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ৪০০টি, পাবনা মানসিক হাসপাতালে ৫০০টি এবং বিএমইউর মনোরোগবিদ্যা বিভাগে ৪০টি শয্যা রয়েছে। বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগে শয্যা রয়েছে প্রায় ১৫০টি। এ ছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও সীমিত পরিসরে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. তৈয়বুর রহমান আমার দেশকে বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি কমাতে সেবার বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। বর্তমানে মূলত রাজধানী ও বিভাগীয় শহরগুলোতে এ ধরনের চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি সেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি সব সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজে মনোরোগবিদ্যা বিভাগ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের জন্য প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি করা দরকার।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টসের (বিএপি) সদস্যসচিব অধ্যাপক ডা. নিজাম উদ্দিন বলেন, সচেতনতার অভাব, ভুল ধারণা, দক্ষ জনবলের সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও অপর্যাপ্ত বাজেট মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রধান প্রতিবন্ধকতা। এসব কারণে অনেক রোগী অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছেন।
তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধেও গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে প্রয়োজনীয় কোর্স চালু করা এবং সংশ্লিষ্ট পদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধা দূর করা জরুরি।
তবে আশার বিষয় হলো, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে বর্তমান সরকার বাজেট বাড়ানো এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি করে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কর্নার চালুসহ বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের মানুষের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য করা সম্ভব হবে।
