আগামী বছরের জানুয়ারিতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয় বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। অন্যদিকে, নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে আরও সময় চায় বিএনপি।
এ পরিস্থিতিতে ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা করতে আজ সোমবার বৈঠকে বসছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বৈঠকের পর জানুয়ারিতে নির্বাচন শুরু হওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রস্তুতির সময় দেওয়ার আহ্বান
গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে কমিটির সভাপতি একেএম সেলিম রেজা হাবিব স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সময় দেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় বেশি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে প্রস্তুতি প্রয়োজন, তা এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। তাই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির সুযোগ দিয়ে তফসিল ঘোষণা করা উচিত।
নির্বাচনের ঝুঁকি ব্যাখ্যা করে সেলিম রেজা হাবিব বলেন, জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা বেশি থাকে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদ ছাড়াও নয়টি সাধারণ ওয়ার্ডের সদস্য এবং তিনটি সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। প্রতিটি কেন্দ্রে প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি থাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাহিনীগুলোকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়।
তিনি জানান, বৈঠকে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা গেলে আগামী বছরের প্রথম দিকেই নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এ ছাড়া বৈঠকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে দেশি-বিদেশি অর্থায়নে নেওয়া কথিত অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তের সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নির্বাচনের আগে আরও সময় চায় বিএনপি
গত শুক্রবার বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি ও সময় নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা হয়। দলীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, নির্বাচনের আগে প্রস্তুতি গুছিয়ে নিতে আরও সময় দেওয়ার পক্ষে কয়েকজন নেতা মত দিয়েছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায় বিএনপি, যাতে ভোটাররা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন। এবার দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে একই পদে বিএনপির একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। এতে দলীয় ভোট বিভক্ত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ ও কোন্দল বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে দলটির নেতারা মনে করছেন।
এ পরিস্থিতি এড়াতে সম্ভাব্য বিরোধগুলো আগেভাগে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের নির্দেশনা দিয়েছেন তারেক রহমান। নির্বাচনের আগে দলীয় ও সাংগঠনিক বিরোধ নিষ্পত্তি এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়।
দলীয় সূত্রের দাবি, বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণার বিষয়টি আলোচনায় এলে কয়েকজন নেতা প্রশ্ন তোলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে সরকার এখনো কমিশনকে প্রয়োজনীয় দায়িত্ব দিয়েছে কি না। এ পর্যায়ে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার এখতিয়ার কমিশনের রয়েছে কি না, তা নিয়েও তাঁরা সংশয় প্রকাশ করেন।
বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্তরে অচলাবস্থা চলছে। তাঁদের দাবি, আগের সরকারের আমলে বিনা ভোটে নির্বাচিত চেয়ারম্যান, মেয়র, কাউন্সিলর ও সদস্যদের অনেকে দায়িত্ব ছেড়ে চলে গেছেন। এ অবস্থায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কিছুটা সময় প্রয়োজন।
তবে দলের কয়েকজন নেতা দ্রুত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নির্বাচন আয়োজনের পক্ষেও মত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, ভোটের আগে প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি গুছিয়ে নেওয়া জরুরি।
আজ নির্বাচন কমিশনের বৈঠক
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে আজ সোমবার বৈঠকে বসছে নির্বাচন কমিশন। গতকাল ইসির উপসচিব মোহাম্মদ শাহ্ আলম বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাঠানো চিঠি অনুযায়ী, আজ সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সভাপতিত্বে তাঁর সভাকক্ষে বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে রয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ। এ ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন কার্যক্রম, কার্ড প্রিন্টিং এবং নির্বাচন পদক নীতিমালার খসড়াসহ মোট ছয়টি বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ, পারসোনালাইজেশন সেন্টারের যন্ত্রপাতির অবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণ, জাতীয় পরিচয়পত্র মুদ্রণ, বকেয়া বিল পরিশোধ এবং নতুন চুক্তি সম্পাদনসংক্রান্ত কমিটির কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ও আলোচনায় থাকবে।
পাশাপাশি ‘জাতীয় নির্বাচন পদক নীতিমালা ২০২৫’-এর খসড়া অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। এ ছাড়া বিবিধ বিষয় নিয়েও আলোচনা হবে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, আগামী জানুয়ারি থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতি, সরকারের প্রয়োজনীয় দায়িত্ব অর্পণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক প্রস্তুতি—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করতে হবে।
ফলে জানুয়ারিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হবে কি না, তা নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রস্তুতির অগ্রগতির ওপর।
