দেশের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন পাঁচ ধাপে আয়োজনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২১ জানুয়ারি। এরপর ৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধাপ, ২৯ এপ্রিল তৃতীয় ধাপ, ১৩ মে চতুর্থ ধাপ এবং ২৭ মে পঞ্চম ধাপের ভোট অনুষ্ঠিত হবে। সব মিলিয়ে ২০২৭ সালের ২৭ মের মধ্যে দেশের প্রায় ৪ হাজার ৩০০টি নির্বাচন উপযোগী ইউনিয়ন পরিষদের ভোট সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নির্বাচন কমিশনের ১৩তম সভায় ইউপি নির্বাচনের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা হয়। সভা শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ নির্বাচনের তারিখগুলো ঘোষণা করেন।
তিনি জানান, প্রথম ধাপে ৮০টি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদে ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হবে। আগামী ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হতে পারে। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট ধাপের ভোটের প্রায় ৩৮ থেকে ৪২ দিন আগে তপশিল ঘোষণা করবেন।
সাত ধাপের পরিকল্পনা থেকে পাঁচ ধাপে নির্বাচন
এর আগে গত ১৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের প্রাক্প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে প্রাথমিকভাবে সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল। সে অনুযায়ী, ১২ নভেম্বর থেকে ভোট শুরু করে ২৭ মে পর্যন্ত নির্বাচন সম্পন্ন করার প্রাথমিক চিন্তা ছিল।
তবে ১৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছিলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ সম্পর্কে সরকার কিছু জানে না। পরে নির্বাচন কমিশন জানায়, সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে।
১৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর সঙ্গে বৈঠকে নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজের বার্ষিক পরীক্ষা এবং অন্যান্য অসুবিধার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এরপর আরও আলোচনা করে নির্বাচনের তারিখ চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ বলেন, দেশের প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে আনুমানিক ৪ হাজার ৩০০টি নির্বাচন উপযোগী রয়েছে। এসব পরিষদের নির্বাচন ২৭ মের মধ্যে শেষ করা হবে। পাঁচটি নির্ধারিত তারিখেই বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি আরও জানান, সব জেলায় একই সঙ্গে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে উপজেলা সদরসংলগ্ন ইউনিয়নগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন বকেয়া রয়েছে অথবা যেসব ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলোও অগ্রাধিকার পাবে। পরবর্তী পর্যায়ে বাকি ইউনিয়নগুলোর নির্বাচন সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বর্ণানুক্রমিক পদ্ধতি অনুসরণের চেষ্টা করা হবে।
সংঘাতমুক্ত নির্বাচন আয়োজনের প্রত্যাশা
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কতটা সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করা সম্ভব—এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একই ধরনের উদ্বেগ ছিল। তা সত্ত্বেও জাতীয় নির্বাচন স্মরণকালের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ আর সংঘাতপূর্ণ নির্বাচনের পথে এগোতে প্রস্তুত নয় বলে কমিশন মনে করে। ভালো নির্বাচনের যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত রাখতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। সবার সহযোগিতা পেলে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনও সংঘাতমুক্ত রাখা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন সানাউল্লাহ।
নভেম্বর থেকে আবার স্মার্ট কার্ড ছাপানো শুরু
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, আগামী নভেম্বর থেকে পার্সোনালাইজেশন সেন্টারে জাতীয় পরিচয়পত্রের স্মার্ট কার্ড মুদ্রণ পুনরায় শুরু হবে।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী সময়ে একটি কমিটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে।
আগামী মাসের মাঝামাঝি থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় স্মার্ট কার্ড মুদ্রণ এবং অডিট আপত্তিসহ অন্যান্য প্রশাসনিক সমস্যার সমাধানের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
মৃত ভোটারের নাম বাদ দিতে পরীক্ষামূলক প্রকল্প
ভোটার তালিকা হালনাগাদ এবং মৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করতে বিকল্প উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
এ লক্ষ্যে কয়েকটি উপজেলা ও ইউনিয়নে পরীক্ষামূলকভাবে একটি পাইলট প্রকল্প চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। আগামী নভেম্বরেই কয়েকটি এলাকায় এ কার্যক্রম শুরু হতে পারে।
সানাউল্লাহ জানান, মৃত ভোটারদের তথ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ করে সময়মতো ভোটার তালিকা থেকে তাঁদের নাম বাদ দেওয়ার বিষয়ে কমিশন সভায় আলোচনা হয়েছে।
ইভিএম নিষ্পত্তির উদ্যোগ দ্রুত করার নির্দেশ
আগামী নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তে নির্বাচন কমিশন অনড় রয়েছে বলে জানান নির্বাচন কমিশনার।
বর্তমানে থাকা ইভিএমগুলো নিষ্পত্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কমিটিকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন জটিলতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আইনি জটিলতা নিরসন করে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংরক্ষিত নারী আসনে উপনির্বাচন ১২ নভেম্বর
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের কারণে শূন্য হওয়া আসনে উপনির্বাচনের তারিখও ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। আগামী ১২ নভেম্বর ওই আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
