মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অস্থিরতা ও সংঘাত চললেও সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে হুতিদের প্রাণঘাতী হামলা দেশটির সেই নিরাপত্তার ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ফলে সৌদিতে বসবাসরত প্রবাসী পরিবারগুলো এখন ভাবতে বাধ্য হচ্ছে, সেখানে তারা আদৌ নিরাপদে নিজেদের জীবন গড়ে তুলতে পারবে কি না।
গত শনিবার ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালায়। এতে অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর টানা তিন দিন হামলা চালায় গোষ্ঠীটি।
হুতিরা সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেল স্থাপনা এবং দাম্মাম বিমানবন্দরেও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তাদের দাবি, ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সরকারি বাহিনীকে রিয়াদের সমর্থন এবং চলতি বছরের শুরুর দিকে সানা বিমানবন্দরে সৌদি বিমান হামলার জবাব হিসেবেই এসব হামলা চালানো হয়েছে।
সৌদি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আল আখবারিয়ায় প্রচারিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা সাদা পোশাক পরা যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি করছেন। বিমানবন্দরের লাউঞ্জে ধুলাবালিতে পরিবেশ আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে এবং ছাদের বিভিন্ন প্যানেল ভেঙে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
রিয়াদে সাত বছর ধরে বসবাসরত ৩৯ বছর বয়সী ব্রিটিশ নাগরিক বিলাল মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ওমরাহ বা হজ পালনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে গিয়ে কাউকে যেন এভাবে জীবনের ঝুঁকিতে পড়তে না হয়।
তিনি বলেন, অতীতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট যুদ্ধে যা-ই করে থাকুক না কেন, হুতিরা কোনোভাবেই এসব হামলার যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে পারে না। সাধারণ মানুষের ওপর হামলা কিংবা বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত হানার কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ নেই।
তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্যবসা, পর্যটন ও বিনিয়োগের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে সৌদি আরব যে ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিল, সাম্প্রতিক হামলা সেই ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে।
গত রোববার সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত একটি জ্বালানি সম্মেলনে মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন প্রতিনিধি অংশ নেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এদিকে মাত্র দুই সপ্তাহ পর দেশটির সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক আয়োজন ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে হামলাগুলো সৌদি আরবের স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তি ধরে রাখার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বিলাল বলেন, সৌদি আরবের উচ্চ বেতনের চাকরি ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবন ছেড়ে যাওয়া তাঁর জন্য কঠিন হবে। তবে হামলার ভয়াবহতা ও ধারাবাহিকতা অনেক প্রবাসী পরিবারকে ভাবতে বাধ্য করছে, বেসামরিক স্থাপনাগুলো আদৌ নিরাপদ কি না।
তিনি বলেন, “যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। আমার পরিবার ও আমি এখানে একটি জীবন গড়ে তুলেছি। কিন্তু পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে এবং হামলা বাড়তে থাকলে পরিবারের সদস্যদের দেশে ফেরত পাঠানোর কথা কি ভাবব? অবশ্যই ভাবব।”
রিয়াদে এক দশক ধরে বসবাসরত মোহাম্মদ নামের আরেক ব্রিটিশ নাগরিক বলেন, পরিবার নিয়ে বসবাসের জন্য সৌদি আরবকে তিনি নিরাপদ মনে করতেন। কিন্তু দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিমানবন্দরকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হামলা থেকে রক্ষা করতে না পারার ঘটনা তাঁকে উদ্বিগ্ন করেছে।
তিনি বলেন, “যা ঘটছে, তাতে আমার সন্তানরাও বেশ ভয় পেয়ে গেছে।”
মোহাম্মদ জানান, সন্তানদের নিরাপদ থাকার আশ্বাস দিলেও পরিস্থিতি বোঝানো কঠিন হয়ে পড়ছে। স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কিছু বিদেশির প্রকাশ্যে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানানোয় শিশুদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
তিনি বলেন, “রিয়াদকে এখন আর নিরাপদ মনে হচ্ছে না।”
অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা হুমকির মুখে
সাম্প্রতিক হামলাগুলো সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর মধ্যকার সংঘাত আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা বর্তমানে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
জুলাই মাসে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী সানা বিমানবন্দরে হামলা চালানোর আগপর্যন্ত সংঘাত অনেকটাই স্থবির ছিল। ইরান থেকে হুতি কর্মকর্তাদের বহনকারী একটি বিমানকে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণাধীন রাজধানীতে অবতরণ করতে বাধা দেওয়াই ওই হামলার উদ্দেশ্য ছিল।
এর জবাবে হুতিরা পাল্টা হামলা ও অবরোধের হুমকি দেয়। তাদের ঘোষণা ছিল, নিজেদের আকাশসীমা ও পরিবহনব্যবহারের সুযোগ সীমিত করার প্রতিক্রিয়ায় সৌদি স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানো হবে।
পরবর্তী সময়ে লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে হুতিরা। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার পর লোহিত সাগর সৌদি আরবের তেল রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুটে পরিণত হয়েছিল।
বর্তমান সংঘাতের শিকড় ২০১৪ সালে শুরু হওয়া দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যে নিহিত। জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্তে জনঅসন্তোষ এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিভাজন নিরসনে জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত জাতীয় সংলাপের ব্যর্থতাকে কাজে লাগায় হুতিরা।
নতুন ফেডারেল কাঠামোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর ইরান-সমর্থিত হুতিরা দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে রাজধানী সানা দখল করে নেয়। এর ফলে প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়।
হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করা।
যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বোমা ও যুক্তরাজ্যের তৈরি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে সৌদি আরব এবং তার মিত্ররা ব্যাপক সামরিক অভিযান চালায়। এই যুদ্ধের ফলে ক্ষুধা, রোগব্যাধি ও জরুরি সেবাব্যবস্থা ধ্বংসের কারণে ইয়েমেনে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
২০১৫ সালে যুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান পরবর্তী সময়ে দেশটিকে বৈদেশিক বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, বিনোদন ও পর্যটনের বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেন।
কিন্তু হুতিদের হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধসহ আঞ্চলিক সংঘাত যুবরাজের সেই অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও ওমান যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি, অবকাঠামো এবং যোগাযোগের সুবিধা দিয়ে আসছে। একই সঙ্গে এসব দেশ মার্কিন অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি কেনার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে।
এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান সামরিক অংশীদার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে।
তবে বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উপসাগরীয় অঞ্চলের এক বিশ্লেষক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর এই সম্পর্ক বর্তমানে গুরুতর টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে।
বিশ্লেষকের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবকে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেরাই সামলানোর কথা বলতে পারেন না, আবার একই সঙ্গে সৌদি আরবের কাছে আশা করতে পারেন না যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নিরাপত্তার নির্ভরযোগ্য নিশ্চয়তা পাচ্ছে বলে বিশ্বাস করবে।
উপসাগরীয় বিশ্লেষকদের উদ্বেগ
ওই বিশ্লেষক বলেন, কূটনীতির পরিবর্তে ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের পথে হাঁটার বিষয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নিয়ে সৌদি আরব ইতিমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ফলে আঞ্চলিক মিত্রদের এমন একটি সংঘাতের পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে, যে সংঘাত তারা নিজেরা বেছে নেয়নি।
রিয়াদে হামলার পর ট্রাম্প যখন বলেন, সৌদি আরব নিজেই নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম, তখন দেশটির অসন্তোষ আরও বেড়ে যায়।
এই অনিশ্চয়তার কারণে গত আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র গুরুত্ব বেড়েছে।
চুক্তিটির লক্ষ্য হলো সম্মিলিত প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা। তবে তুরস্ক তার পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করায় সৌদি আরবে তুর্কি সেনা মোতায়েনের সময় ও পরিধি নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিশ্লেষক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোকে মার্কিন অস্ত্র কেনার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করতে এবং ওয়াশিংটনকে কেন্দ্র করে নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে উৎসাহিত করেছে।
কিন্তু যখন হুমকি বাস্তবে রূপ নিয়েছে, তখন সৌদি আরব নিজেই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে বলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা সেই দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের প্রকৃত মূল্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।







