কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে স্ত্রী, একমাত্র সন্তান, শ্যালক ও তিন শ্যালিকাকে হারিয়েছেন বরিশালের উজিরপুরের নূর আলম। অফিসের জরুরি কাজে দুর্ঘটনার মাত্র এক দিন আগে কক্সবাজার থেকে চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসায় প্রাণে বেঁচে যান তিনি। তবে মুহূর্তের মধ্যে পরিবারের ছয় সদস্যকে হারিয়ে শোকে নির্বাক হয়ে পড়েছেন এই ব্যক্তি।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মর্মান্তিক এই ঘটনায় নিহতদের স্বজনদের মধ্যে চলছে শোকের মাতম। নূর আলমের পরিবারের এমন করুণ পরিণতিতে বরিশালের উজিরপুরের গাজীরপাড় গ্রামসহ চুয়াডাঙ্গার পরিচিতজনদের মধ্যেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
অফিসের কাজে ফিরে আসায় বেঁচে যান নূর আলম
নূর আলম বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বড়কোঠা ইউনিয়নের গাজীরপাড় গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বেসরকারি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা হিসেবে চুয়াডাঙ্গায় কর্মরত। চাকরির সুবাদে প্রায় আট বছর ধরে তিনি চুয়াডাঙ্গা শহরের দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ায় স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নূর আলমের স্ত্রী ফারিয়া কবির (৩৩) বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। এর মধ্যেও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাতে তারা কক্সবাজার ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন।
গত ১৪ অক্টোবর স্ত্রী ফারিয়া কবির ও পাঁচ বছর বয়সী একমাত্র ছেলে ফাইজান নূরকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় যান নূর আলম। পরদিন শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের সঙ্গে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন তারা।
কক্সবাজারে পৌঁছানোর পর অফিসের জরুরি কাজ থাকায় শুক্রবার নূর আলম একাই চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসেন। পরদিন শনিবার সকালে গণমাধ্যমে ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের খবর দেখে তিনি পরিবারের সদস্যদের খোঁজ নিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে জানতে পারেন, আগুনে নিহতদের মধ্যে তাঁর স্ত্রী, সন্তানসহ পরিবারের ছয়জন রয়েছেন।
একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু
অগ্নিকাণ্ডে নিহত নূর আলমের স্বজনেরা হলেন তাঁর স্ত্রী ফারিয়া কবির (৩৩), পাঁচ বছর বয়সী ছেলে ফাইজান নূর, শ্যালক নাসির উদ্দিন (২৫) এবং তিন শ্যালিকা ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩)।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মোট ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া দগ্ধ হয়ে ছয়জন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দগ্ধদের মধ্যে রয়েছেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন ও তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান, ইসমাইল হোসেন মাসুদ ও তাঁর স্ত্রী মেহেরুন নেছা, মান্নান এবং সামিদা। ইসমাইল হোসেন ও মেহেরুন নেছা নিহত ফারিয়া কবিরের মামা-মামি। তাঁদের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার দক্ষিণ ঠেটালিয়া গ্রামে।
বিয়ের পর স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে গ্রামে যাওয়া হয়নি
নূর আলমের বাবা মোহাম্মদ আলী রাড়ি জানান, বিয়ের পর ছেলে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে কখনোই উজিরপুরের গ্রামের বাড়িতে আসেননি। নূর আলমের শ্বশুরবাড়ি পটুয়াখালীর তালতলীতে হলেও শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা ঢাকার বনশ্রী এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন।
ছেলের স্ত্রী, নাতি এবং শ্যালক-শ্যালিকাসহ পরিবারের ছয় সদস্যকে হারানোর খবর তাঁদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক বলে জানান মোহাম্মদ আলী রাড়ি। প্রাথমিকভাবে মরদেহগুলো ঢাকায় দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
যে ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটানো, সেই ভ্রমণই নূর আলমের জীবনে সবচেয়ে বড় শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বজনদের সঙ্গে তোলা ছবিগুলো এখন তাঁর কাছে শুধুই স্মৃতি।
চুয়াডাঙ্গায় মা-ছেলের মৃত্যুতে শোক
অগ্নিকাণ্ডে নূর আলমের স্ত্রী ফারিয়া কবির ও তাঁদের পাঁচ বছর বয়সী ছেলে ফাইজানের মৃত্যুতে চুয়াডাঙ্গা শহরের দক্ষিণ হাসপাতালপাড়া এলাকায় শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
ফারিয়ার পৈতৃক বাড়ি বরিশালে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অবকাশযাপনের উদ্দেশ্যে গত ১৪ অক্টোবর তাঁরা কক্সবাজারে যান। কিন্তু সেই আনন্দভ্রমণই তাঁদের জীবনের শেষ ভ্রমণে পরিণত হবে, তা কেউ কল্পনাও করেননি।
শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুন ছড়িয়ে পড়লে অনেকে ভেতরে আটকা পড়েন। ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ফারিয়া ও তাঁর ছোট্ট সন্তান। মা-ছেলের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতজনেরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
মতলব উত্তর থেকেও একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ফতেপুর পূর্ব ইউনিয়নের দক্ষিণ ঠেটালিয়া গ্রামের রুহুল আমিন ঢালীর পরিবারের ১০ সদস্য কক্সবাজারের পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে অবস্থান করছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জন অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন।
পরিবারের বেঁচে যাওয়া চারজনের মধ্যে আহত মাসুদ ও তাঁর স্ত্রী মেহেরুন নেছা মিলা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অন্য দুই সদস্য নুরে আলম ও আসিক সুস্থ ছিলেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
রুহুল আমিন (লিলু) ঢালী জানান, শনিবার সকাল ৭টার দিকে রিসোর্টটিতে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত
ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক ধারণা, রিসোর্টের রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।
ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকেও রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে ঝুঁকির কথা জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এ বিষয়ে আগে সতর্কও করা হয়েছিল।
একটি পরিবারের ছয় সদস্যসহ একাধিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যে। দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণ এবং অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।







