মেয়ের প্রসাধনী, হস্তশিল্প, গৃহস্থালির নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিংবা হরেক রকমের খেলার সামগ্রী—সবই রয়েছে সেখানে। দেখতে আর দশটা সাধারণ গ্রামীণ মেলার মতোই এর রূপ। তবে এর সবচেয়ে বড় ব্যতিক্রম হলো, এই মেলায় দর্শনার্থী ও ক্রেতা হিসেবে কেবল নারীরাই অংশ নিতে পারেন। পুরুষদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকায় এই ব্যতিক্রমী আয়োজনটি স্থানীয়ভাবে ‘বউ মেলা’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধনসম্পদের দেবী শ্রীশ্রী লক্ষ্মীপূজার পরের দিন ঐতিহ্যগতভাবে এই মেলার আয়োজন করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় সোমবার (২৬ অক্টোবর ২০২৬) দিনব্যাপী দিনাজপুরের ফুলবাড়ী পৌরএলাকার সুজাপুর গ্রামের সর্বজনীন দুর্গা মন্দির চত্বরে বসেছিল এই বর্ণিল মেলা। মূলত সকাল থেকেই নারীদের উপচে পড়া ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে মেলার প্রাঙ্গণ, যা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, মেলায় হরেক রকমের পণ্য নিয়ে শতাধিক ছোট-বড় দোকান বসেছে। প্রসাধনী, শিশুখেলনা, গৃহসজ্জার সামগ্রী থেকে শুরু করে নানা ধরনের সুস্বাদু খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। স্টলগুলোতে কিছু পুরুষ বিক্রেতা উপস্থিত থাকলেও নারী ক্রেতাদের সুরক্ষায় পুরুষ দর্শনার্থীদের প্রবেশে ছিল কঠোর নিষেধাজ্ঞা। তবে মেলার প্রধান ফটকের বাইরে প্রিয়জনদের সঙ্গে নিয়ে আসা অনেক উৎসুক পুরুষকে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।
মেলায় আসা বাসুদেবপুর গ্রামের পল্লবী রানী নিজের অনুভূতির কথা জানিয়ে বলেন, “এই মেলা একান্তভাবেই আমাদের নারীদের। ফলে এখানে ঘুরে বেড়ানোর এক আলাদা আনন্দ ও অনুভূতি কাজ করে। দূরদূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজনরাও এই মেলায় আসেন, অনেকের সঙ্গে দেখা হয় এবং ভাববিনিময় হয়। মেলা মানেই তো এক মিলনমেলা।”
আরেক দর্শনার্থী সুজিতা পাল জানান, তারা দলবেঁধে মেলা থেকে অনেক কেনাকাটা করেছেন এবং প্রতিবছর এই দিনটির জন্য মুখিয়ে থাকেন। তবে মেলায় কোনো ঝামেলা না থাকলেও স্বামীকে বাইরে অপেক্ষায় রেখে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়েছে বলে জানান তিনি। একইভাবে গর্ববোধ প্রকাশ করে পূরবী রানী দাস বলেন, “কেবল মেয়েদের জন্য এই মেলা হওয়ায় নারীদের দারুণভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। দাদাকে সঙ্গে নিয়ে এলেও তাঁকে বাইরে রেখেই মেলায় ঘুরতে হয়েছে।”
মেলার নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুরুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নারীরা যাতে কোনো ধরনের অস্বস্তি ছাড়া স্বাধীনভাবে মেলা উপভোগ করতে পারেন, সেজন্য তাঁরা স্বেচ্ছায় বাইরে পাহারার দায়িত্ব পালন করেন। শিবেন সরকার নামের এক দর্শনার্থী জানান, স্ত্রী-সন্তানদের ভেতরে পাঠিয়ে বাইরে অপেক্ষা করালেও এই ভিন্নধর্মী আয়োজন তাঁরা বেশ উপভোগ করেন, যেখানে কোনো ধরনের ঝুটঝামেলা থাকে না। অরুণ সাহা নামে আরেক স্থানীয় ব্যক্তি বলেন, “বছরের এই একটি দিন নারীদের স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ দিতে পেরে আমাদেরও ভালো লাগে।”
মেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে আয়োজক সুজাপুর সর্বজনীন দুর্গা মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি অশেষ রঞ্জন দাস ও সাধারণ সম্পাদক গৌর চন্দ্র সরকার জানান, প্রায় ৭০ বছর আগে জমিদার বিমল বাবু এই ব্যতিক্রমী মেলার গোড়াপত্তন করেছিলেন। সেই থেকে কোনো ধরনের বাধা-বিঘ্ন ছাড়াই যুগের পর যুগ এই ঐতিহ্য চলে আসছে। কেবল নারীদের উৎসর্গ করে এমন মেলা দেশের আর কোথাও হয় কি না তা তাঁদের জানা নেই। মেলার সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা তৎপর ছিলেন।
ফুলবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম জানান, ঐতিহ্যবাহী এই ‘বউ মেলা’ শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদে সম্পন্ন করতে পুলিশ সদস্যরা মাঠে সক্রিয় দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুম বিল্লাহ জানিয়েছেন, মেলার আয়োজকদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো না থাকায় বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না।
