একসময় রাজধানীর অভিজাত শপিং মলগুলোর অন্যতম ছিল শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ে অবস্থিত কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি। ১৯৯৮ সালে যাত্রা শুরু করা এই বিপণিবিতানে ছিল বিভিন্ন ব্র্যান্ডের শোরুম, পোশাক, জুতা, প্রসাধনী ও উপহারসামগ্রীর দোকান। ক্রেতাদের আকর্ষণ করতে ছিল ফুড কোর্ট ও বাগানও। তবে সময়ের সঙ্গে ক্রেতা কমতে থাকায় একের পর এক দোকান বন্ধ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত লোকসান ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ সামলাতে না পেরে গত ১ অক্টোবর থেকে বিপণিবিতানটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারিয়েছে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি। ফ্লাইওভার নির্মাণের কারণে যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন, করোনাকালে ব্যবসায়িক মন্দা, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের অন্যত্র চলে যাওয়া এবং ক্রেতাদের আস্থার সংকট এর পতনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি অনলাইন কেনাকাটার বিস্তার এবং বড় শপিং মলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়াও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
১৯৮ দোকান থেকে চালু ছিল মাত্র ১৭টি
২০ তলা ভবনটির নিচতলা থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো। ওপরের তলাগুলো আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। চালুর সময় বিপণিবিতানটিতে দোকানের সংখ্যা ছিল ১৯৮টি। কিন্তু বন্ধ ঘোষণার সময় চালু ছিল মাত্র ১৭টি। ক্রেতাসংকটের কারণে বাকি দোকানগুলোর অধিকাংশই আগেই বন্ধ হয়ে যায়।
ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় থেকেই পতনের শুরু
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি দোকান মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাকী বিল্লাহ ওসমানী জানান, ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় থেকেই বিপণিবিতানটির ব্যবসায়িক অবনতি শুরু হয়। ২০১৬-১৭ সালের দিকে নির্মাণকাজের কারণে আশপাশের সড়কে যানজট, ধুলাবালি ও চলাচলে নানা ভোগান্তি তৈরি হয়। এতে অনেক ক্রেতা ও ব্যবসায়ী আগ্রহ হারান।
সে সময় বেশ কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী অন্য মার্কেটে চলে যান। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও তাঁরা আর ফিরে আসেননি। এরপর করোনাভাইরাস মহামারির সময় ব্যবসায় বড় ধরনের ধস নামে। অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী তাঁদের দোকান বন্ধ করে দেন।
বাকী বিল্লাহ ওসমানীর ভাষ্য, অনলাইনে কেনাকাটার জনপ্রিয়তা বাড়ায় ক্রেতাদের আগের মতো বিপণিবিতানে আসার প্রবণতা কমেছে। এ ছাড়া এখানে পণ্যের বৈচিত্র্যও সীমিত ছিল। এক জায়গায় প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য কেনার সুযোগ না থাকায় ক্রেতাদের আগ্রহ ক্রমেই কমতে থাকে।
মাসে পরিচালন ব্যয় ১৫ লাখ, বিদ্যুৎ বিল বকেয়া ৬০ লাখ টাকার বেশি
বিপণিবিতানটি চালু রাখতে প্রতি মাসে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হতো বলে জানান বাকী বিল্লাহ ওসমানী। তাঁর দাবি, গত ছয় মাসে সার্ভিস চার্জ বাবদ মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকার বেশি আদায় করা সম্ভব হয়নি।
এ পরিস্থিতিতে সমিতির কর্মকর্তা ও কয়েকজন দোকানমালিক ঋণ নিয়ে আরও ছয় থেকে আট মাস বিপণিবিতানটি চালু রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য খরচের বকেয়া বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিপণিবিতানটির বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়েছে ৬০ লাখ টাকারও বেশি। দীর্ঘদিনের লোকসান ও পরিচালন ব্যয় সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ায় দোকানমালিকদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে।
নামী ব্র্যান্ডের নামে নিম্নমানের পণ্য বিক্রির অভিযোগ
ব্যবসায়িক পতনের পেছনে পণ্যের মান ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটকেও দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিম্নমানের পণ্য বিদেশি বা নামী ব্র্যান্ডের পণ্য হিসেবে বিক্রি করতেন। এতে ক্রেতাদের মধ্যে বিপণিবিতানটির প্রতি আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়।
অন্যদিকে, ই-কমার্স ও ফেসবুকভিত্তিক কেনাকাটার প্রসার পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। বসুন্ধরা সিটি ও যমুনা ফিউচার পার্কের মতো বড় শপিং মলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়ও পিছিয়ে পড়ে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি। ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদা ও কেনাকাটার অভ্যাসের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারাও এর ব্যবসায়িক অবনতির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
ভবন বিক্রি বা ভাড়া দেওয়ার পরিকল্পনা
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বিপণিবিতানের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ হলেও ভবনটির ওপরের তলাগুলোর আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট চালু রয়েছে। অর্থাৎ, বন্ধের সিদ্ধান্তটি কেবল বাণিজ্যিক অংশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
কর্ণফুলী গ্রুপের উদ্যোগে নির্মিত এই বিপণিবিতানের অধিকাংশ দোকান আগেই ব্যক্তিমালিকানায় নিবন্ধন করে বিক্রি করা হয়েছিল। বর্তমানে ভবনটি বিক্রি অথবা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন মালিকেরা। তবে গত দুই বছর ধরে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান খোঁজার চেষ্টা করেও তাঁরা সফল হননি।
একসময় রাজধানীর অভিজাত কেনাকাটার অন্যতম গন্তব্য হিসেবে পরিচিত কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া নগরীর পরিবর্তিত ব্যবসায়িক বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে। ক্রেতাদের রুচি ও চাহিদার পরিবর্তন, অনলাইন কেনাকাটার বিস্তার, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠিত বিপণিবিতানও যে টিকে থাকার সক্ষমতা হারাতে পারে, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি তারই উদাহরণ।

