ইসরাইলের নির্বাচনের পর দেশটির নেতৃত্ব দেওয়া নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি করছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট। বুথফেরত জরিপে দুই নেতার নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে দুই নেতার অবস্থানে রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য। নির্বাচনি প্রচারেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
ইসরাইলের সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান ও জেনারেল গাদি আইজেনকোট এমন একটি আধুনিক ইসরাইলের ধারণায় বিশ্বাসী, যেখানে ইহুদি ও আরব জনগোষ্ঠী সহাবস্থান করবে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় যুদ্ধে তাঁর এক ছেলে নিহত হন। ওই বছরের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর দুই মাস পর এ ঘটনা ঘটে।
আইজেনকোটের মতে, ইরানকে পরাজিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সামরিক হামলার পক্ষে থাকলেও তিনি সর্বাত্মক যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার বিরোধী।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর বিশ্বাস, ইসরাইলের স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন অপরিহার্য। নিজের অবস্থান তুলে ধরতে ভোটের এক দিন আগে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি তেল আবিবে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের একটি ছবি প্রকাশ করেন।
সিএনএনের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের আগে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এতে সম্মতি দেননি। ইরান নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে তখনো সিদ্ধান্ত বিবেচনা করছিলেন তিনি।
ইসরাইলের একটি সূত্র সিএনএনকে জানায়, নেতানিয়াহু নির্বাচনের আগে ইরানে যৌথ হামলার বিষয়ে ট্রাম্পকে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন। তবে ট্রাম্প সবুজ সংকেত দেননি। এদিকে নেতানিয়াহুর কার্যালয় এ প্রতিবেদনকে ‘ভুয়া খবর’ বলে অভিহিত করেছে।
নির্বাচন পেছানোর উদ্দেশ্যে নেতানিয়াহু আবারও যুদ্ধ শুরু করার চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগ অবশ্য এবারই প্রথম নয়। আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সঙ্গে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে রয়েছেন তিনি।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে দুই নেতার ভিন্ন অবস্থান
ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সাবেক প্রধান আইজেনকোট মনে করেন, ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন একটি ‘বাস্তবায়নযোগ্য লক্ষ্য নয়’। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নেতানিয়াহুর যুদ্ধনীতির সমালোচনা করে আসছেন। তাঁর মতে, নেতানিয়াহুর যুদ্ধনীতি যথাযথ পরিকল্পনাভিত্তিক নয়। যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
অতীতে সামরিক অভিযানের পক্ষে থাকলেও বর্তমানে আইজেনকোট ট্রাম্পের ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ নীতিকে সমর্থন করছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, তাঁর মতে, নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানকে পরাজয়ের মুখে ঠেলে দেওয়া বেশি কার্যকর হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নেও নেতানিয়াহুর সঙ্গে আইজেনকোটের মতপার্থক্য রয়েছে। নেতানিয়াহুর মতে, ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্কই ইসরাইলের নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় ভিত্তি। বিপরীতে আইজেনকোট মনে করেন, ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ইসরাইলকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে হবে। তাঁর মতে, দেশটির স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বুথফেরত জরিপে কী দেখা যাচ্ছে
নির্বাচনে নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থি ও ধর্মীয় দলগুলোর জোটের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষের আভাস পাওয়া গেছে। তবে বুথফেরত জরিপে কোনো পক্ষেরই সুস্পষ্ট বিজয়ের ইঙ্গিত মেলেনি। দীর্ঘদিনের যুদ্ধের পরও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক পরাজয় নিশ্চিত নয়।
জরিপের ফল অনুযায়ী, পরবর্তী সংসদে বর্তমান সরকারের বিরোধীরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে। তবে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকায় তারা শেষ পর্যন্ত একজোট হয়ে সরকার গঠন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিরোধী দলগুলোর মধ্যে আরব নেতৃত্বাধীন কয়েকটি দলও রয়েছে। নির্বাচনে এসব দলের ঐতিহাসিক সাফল্যের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব জনগোষ্ঠীর। তাদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে নিয়ে জোট গঠন সম্ভব হলে সরকার গঠনের আলোচনা কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত গড়াতে পারে।
ভোট গ্রহণের পর এক অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহুকে আত্মবিশ্বাসী দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে তিনি গত তিন বছরের সামরিক সাফল্যের তালিকা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর প্রতি তাঁর পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।
তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে দেন নেতানিয়াহু। এসব দলের সঙ্গে রাজনৈতিক অংশীদারত্বকে তিনি ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার’ সঙ্গে তুলনা করেন।
সূত্র: এনডিটিভি







