নিজ ক্যাম্পাসও দেশের ছাত্রীদের জন্য নিরাপদ নয়। জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ইউএন-উইমেনের এক নতুন জরিপে উঠে এসেছে এক alarming চিত্র। এতে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রায় ৭৬ শতাংশ ছাত্রীই কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হন।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাতের নেতৃত্বে এমডিজি অ্যাচিভমেন্ট ফান্ডের সহায়তায় এই গবেষণা পরিচালিত হয়। বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও মেডিকেল কলেজের ৮৯৭ জন মেয়ে শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত এই জরিপের কাজ ২০১২ সালের জুলাই থেকে শুরু হয়ে পরবর্তী বছরের মে পর্যন্ত চলে।
জরিপ অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী সরকারি বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়রানির হার সবচেয়ে বেশি—৮৭ শতাংশ। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোতে ৭৬ শতাংশ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৬ শতাংশ এবং মেডিকেল কলেজগুলোতে ৫৪ শতাংশ ছাত্রী যৌন হয়রানির শিকার হন।
হয়রানিকারীদের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নিজ শ্রেণির নয় বরং অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মাধ্যমেই ছাত্রীরা বেশি হয়রানির শিকার হন। মোট শিকারের দুই-তৃতীয়াংশই তাদের মাধ্যমে হয়রানির শিকার হন। এছাড়া ২৫ শতাংশ সহপাঠী এবং ৭ দশমিক ৯ শতাংশ ক্যাম্পাসে আসা বাইরের পুরুষদের মাধ্যমে হয়রানির শিকার হন। এর বাইরে বিভাগীয় ও অন্যান্য বিভাগের পুরুষ শিক্ষকদের দ্বারাও ছাত্রীরা হেনস্থার শিকার হয়ে থাকেন। ক্লাস চলাকালীন, বিরতির সময়ে, করিডর কিংবা খেলার মাঠে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে।
সবচেয়ে বেশি ঘটে অশালীন মন্তব্যের মাধ্যমে হয়রানি, যার হার ৪৫ শতাংশ। এছাড়া প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ছাত্রী মুঠোফোনে কল ও খুদে বার্তার মাধ্যমে হয়রানির মুখে পড়েন। যৌন অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শনে ১৫ শতাংশ, সরাসরি শরীর স্পর্শ করে ১২ শতাংশ, প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ১১ শতাংশ, নজরদারিতে ৯ শতাংশ, ইন্টারনেটের মাধ্যমে ৬ শতাংশ এবং ৫ শতাংশ ছাত্রী নিজেদের থাকার বা পড়ার স্থানে যৌন হয়রানির শিকার হন।
এই হয়রানির ফলে ছাত্রীদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়। জরিপ বলছে, ৫৩ শতাংশ ছাত্রী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। অনেকে পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন, সমাজ থেকে গুটিয়ে যান এবং কেউ কেউ চরম পথ বেছে নিয়ে আত্মহত্যার মতো ট্র্যাজেডির শিকার হন।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ৯০ শতাংশ ছাত্রীই এসব ঘটনার কোনো প্রতিবাদ করেন না। এর মধ্যে অর্ধেক শিক্ষার্থীই সম্পূর্ণ চুপ থাকেন। ২৮ শতাংশ শুধু নারী বন্ধুদের জানালেও কোনো প্রতিকার পান না। লজ্জা ও সামাজিক মর্যাদার ভয়ে মাত্র ৭ শতাংশ ছাত্রী বিষয়টি পরিবারকে জানান।
প্রতিবেদনে আরও প্রকাশ পায় যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা’ সম্পর্কে মাত্র ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী ধারণা রাখেন। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই প্রতিরোধ কমিটি কাগজে-কলমে থাকলেও তার কোনো কার্যকর ভূমিকা নেই।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে হাইকোর্ট ১৬ ধরনের কর্মকাণ্ডকে যৌন হয়রানি হিসেবে চিহ্নিত করে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করেছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই তা উপেক্ষিত রয়ে গেছে।
পরিস্থিতি উত্তরণে সচেতনতামূলক লিফলেট ও বই বিতরণ, কম্পিউটার ল্যাবে নজরদারি বাড়ানো, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা এবং কার্যকর যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সেল গঠনের জোরালো সুপারিশ করা হয়েছে।
