গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সংকট নিরসন এবং দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব বন্ধসহ সাত দফা দাবিতে শনিবার ঢাকা থেকে খুলনা, যশোর ও ঝিনাইদহ হয়ে কুষ্টিয়া পর্যন্ত লংমার্চ করবে ১১ দলীয় ঐক্য। প্রায় ৪১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই কর্মসূচিতে ১৯ জেলার নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা অংশ নেবেন। আয়োজকদের প্রত্যাশা, লংমার্চের বহরে প্রায় দেড় হাজার গাড়ি যুক্ত হবে।
শুক্রবার বেলা ১১টায় রাজধানীর মগবাজারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। লংমার্চের প্রস্তুতি, যাত্রাপথ ও কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণের সাত দফা দাবি আদায় এবং সরকারের ব্যর্থতা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রতিবাদে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে তৃতীয়বারের মতো এ লংমার্চ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আগের দুটি কর্মসূচির তুলনায় এবারের লংমার্চ হবে সবচেয়ে দীর্ঘ।
তিনি জানান, কর্মসূচি সফল করতে জোটের শরিক দলগুলো নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রস্তুতি নিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। লংমার্চের মাধ্যমে সাত দফা দাবির পক্ষে জনমত গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকারের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার বিষয়গুলো জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে।
সাত দফা দাবিতে সরকারের প্রতি আহ্বান
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন: মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটের রায় অস্বীকার করে সরকার রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর করছে। একই দিনে অনুষ্ঠিত দুটি ভোটের একটির ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও অন্য ভোটের ফলাফল উপেক্ষা করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এটি দ্বিচারিতা এবং জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গের শামিল।
তিনি বলেন, সরকার আন্তরিক হলে আগামী ৯ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় সংসদ অধিবেশনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের মাধ্যমে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দল সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
জুলাই গণহত্যার বিচার: জামায়াতের এই নেতা বলেন, জুলাই আন্দোলনে সহস্রাধিক মানুষ নিহত এবং প্রায় ৪০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকে এখনো দেশে ও বিদেশে চিকিৎসাধীন। আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হয়নি উল্লেখ করে তিনি জড়িত ব্যক্তিদের, বিশেষ করে এখনো গ্রেপ্তার না হওয়া অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি সংকট: বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস, সারসহ বিভিন্ন জ্বালানি খাতের সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার। তাঁর দাবি, সংকটের সমাধান না করে নতুন করে গ্যাসসহ বিভিন্ন জ্বালানির দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। জনদুর্ভোগ কমাতে সরকারকে অবিলম্বে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি: দেশে হত্যা, সহিংসতা, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও রাজনৈতিক সংঘাত বাড়ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এমনকি সরকারি দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ থেকেও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে বলে উল্লেখ করেন এই জামায়াত নেতা। তাঁর ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত: সরকারের বিভিন্ন স্তরে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে গোলাম পরওয়ার বলেন, সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জেলা প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব বন্ধ: দেশের বিভিন্ন স্থানে দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, অবৈধ নিয়োগ, ডিলারশিপ বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অভিযোগ রয়েছে বলে জানান গোলাম পরওয়ার। তাঁর দাবি, হাটবাজার, ঘাট, বালুমহাল, পরিবহন খাত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি অব্যাহত রয়েছে। চাঁদাবাজির ধরন অপরিবর্তিত থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় ও দলের নাম বদলেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
১৯ জেলার নেতাকর্মী, বহরে থাকতে পারে দেড় হাজার গাড়ি
মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, ঢাকা ও আশপাশের এলাকা ছাড়াও খুলনা, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়াসহ মোট ১৯ জেলার নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা লংমার্চে অংশ নেবেন। শুরুতে ছয় শতাধিক গাড়ি নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও পথে বিভিন্ন স্থান থেকে গাড়ি যুক্ত হয়ে বহরের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজারে পৌঁছাতে পারে বলে আশা করছেন আয়োজকেরা।
তিনি বলেন, কর্মসূচি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সঙ্গে নিয়ম অনুযায়ী যোগাযোগ ও সমন্বয় করা হয়েছে। ঢাকা ও খুলনা রেঞ্জের পুলিশ প্রশাসন, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায় থেকে সহযোগিতার আশ্বাসও পাওয়া গেছে।
লংমার্চের কারণে মহাসড়কে সাধারণ মানুষের চলাচল এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে সাময়িক অসুবিধা হতে পারে বলে স্বীকার করেন গোলাম পরওয়ার। এ জন্য পথচারী, পরিবহনশ্রমিক, ব্যবসায়ী, দোকানদারসহ সংশ্লিষ্ট সবার কাছে আগাম দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।
সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে মহাসড়কের এক পাশ ব্যবহার করে কর্মসূচি পরিচালনার চেষ্টা করা হবে বলে জানান তিনি।
লংমার্চে অংশগ্রহণকারীদের ধৈর্য, সংযম ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, কোনো ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য, স্লোগান কিংবা প্রতিপক্ষকে আঘাত করে এমন আচরণ করা যাবে না। পথে নতুন কোনো জেলা থেকে গাড়ি বহরে যুক্ত হলে সেগুলো বহরের পেছনে যুক্ত করতে হবে।
এ ছাড়া নিরাপত্তা, চিকিৎসা, অ্যাম্বুলেন্স, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা দলগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করবে। দীর্ঘ যাত্রার জন্য অংশগ্রহণকারীদের প্রয়োজনীয় খাবার, পানি, ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী সঙ্গে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক গাড়ির টোলের টাকাও নিজ দায়িত্বে প্রস্তুত রাখতে হবে।
বায়তুল মোকাররম থেকে সকাল ৮টায় যাত্রা
আয়োজকদের ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৭টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এতে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেবেন। সমাবেশ শেষে সকাল ৮টায় ছয় শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে যাত্রা শুরু হবে।
লংমার্চের নির্ধারিত পথ হলো ঢাকা থেকে শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাটের ফকিরহাট ও রূপসা সেতু হয়ে খুলনা। এরপর যশোর ও ঝিনাইদহ হয়ে বহর কুষ্টিয়ায় পৌঁছাবে। সেখানে শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী জনসভা অনুষ্ঠিত হবে।
ছয় স্থানে পথসভা, রাতে কুষ্টিয়ায় সমাপনী সমাবেশ
লংমার্চ চলাকালে নির্ধারিত ছয়টি স্থানে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী—
-
সকাল ৯টা: শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবায় প্রথম পথসভা।
-
সকাল ১১টা: বাগেরহাটের ফকিরহাটের কাঁটাখালীর মোড়ে দ্বিতীয় পথসভা।
-
দুপুর সাড়ে ১২টা: খুলনা মহানগরীর বাবরী চত্বরে তৃতীয় পথসভা।
-
দুপুর ২টা: ফুলতলা বাসস্ট্যান্ডের স্বাধীনতা চত্বরে চতুর্থ পথসভা।
-
বিকেল সাড়ে ৩টা: যশোরের মুড়লীর মোড়ে পঞ্চম পথসভা।
-
বিকেল ৫টা: ঝিনাইদহ বাস টার্মিনালে ষষ্ঠ পথসভা।
সবশেষে রাত সাড়ে ৮টায় কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী জনসভায় অংশ নেবেন লংমার্চের নেতাকর্মীরা।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল ও অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, মোবারক হোসাইন, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের প্রচার সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে লংমার্চ সফল করতে দেশবাসী, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, গণমাধ্যমকর্মী এবং কর্মসূচির আওতাভুক্ত এলাকার সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
