ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত মার্কিন করদাতাদের অন্তত ৪ হাজার ৭১০ কোটি ডলার (৪৭.১ বিলিয়ন ডলার) ব্যয় হয়েছে বলে মার্কিন কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে পেন্টাগন। গত সপ্তাহে প্রকাশিত এই চাঞ্চল্যকর হিসাবটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে আগামী দুই বছর মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির হাতে থাকবে, নাকি তা হাতছাড়া হয়ে বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের দখলে যাবে। পেন্টাগন জানিয়েছে, গত বছরের জুলাইয়ে ট্রাম্পের স্বাক্ষর করা ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’ (OBBA)-এর অধীনে দেওয়া সামরিক তহবিলের প্রায় ৯৭.৫ শতাংশ অর্থই ইতোমধ্যে খরচ হয়ে গেছে।
পেন্টাগনের বিস্তারিত হিসাব অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সামরিক অভিযান পরিচালনা ছাড়াও যুদ্ধে ব্যবহৃত বোমাপাথোর ও গোলাবারুদ পুনর্সংগ্রহ করতেই ব্যয় ধরা হয়েছে ২,৯০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে কেবল মার্কিন বিমানবাহিনী যুদ্ধবিমান ও বোমারু বিমানের পেছনে ৭৬০ কোটি ডলার এবং নৌবাহিনী তাদের বিমানবাহী রণতরী ও দুই ডজন যুদ্ধজাহাজের পেছনে ১৫০ কোটি ডলার ঢেলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের অধীনে মোতায়েন থাকা ৫০ হাজারের বেশি সেনার পেছনে ব্যয় হয়েছে ২১০ কোটি ডলার। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সরঞ্জাম প্রতিস্থাপনে ৬১০ কোটি ডলার, বিশেষ বাহিনীর পরিবহনে ৬৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং আহত সেনাসদস্যদের চিকিৎসায় ২ কোটি ৪৫ লাখ ডলার খরচ হয়েছে।
তবে এই বিশাল ৪,৭১০ কোটি ডলারের ব্যয়ের মধ্যেও যুদ্ধের প্রকৃত ক্ষতির পূর্ণ চিত্র উঠে আসেনি। ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর সংস্কার খরচ এবং বিশাল যুদ্ধজাহাজ ও বোমারু বিমানের জ্বালানি ব্যয় এই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। পেন্টাগন সরকারিভাবে ১৮ জন সেনা নিহতের কথা স্বীকার করলেও সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা অন্তত ২২ এবং ডিসিএএস-এর তথ্য মতে এখন পর্যন্ত ৮৬৫ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন।
ইতিমধ্যেই এই যুদ্ধের বিশাল প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রায়। মার্চের শুরু থেকে ইরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম গ্যালনপ্রতি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৬.৩৫ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের পরিবহনে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৪০ লাখ কোটি (৪০ ট্রিলিয়ন) ডলারের রেকর্ড মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
এমন অর্থনৈতিক সংকটের মুখে মার্কিন নাগরিকদের কাছে ট্রাম্পের এই যুদ্ধ ক্রমেই তীব্র অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট মেয়াদের মধ্যে তাঁর জনসমর্থন বা অ্যাপ্রুভাল রেটিং নেমে সর্বনিম্ন ৩৩ শতাংশে ঠেকেছে। সর্বশেষ জনমত জরিপেও ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের চেয়ে ৮.২ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছে। ডেমোক্র্যাট নেতা ডক শুমার তোপ দেগে বলেছেন, “কোনো বৈধ কর্তৃত্ব বা বের হওয়ার কৌশল ছাড়াই ট্রাম্প মার্কিন পরিবারগুলোকে এক অন্ধ ও বিপর্যয়কর যুদ্ধে পিষে মারছেন।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে “নতুন কোনো যুদ্ধে না জড়ানো” এবং “আমেরিকান অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা”—ট্রাম্পের যে দুটি মূল প্রতিশ্রুতি ছিল, এই ইরান যুদ্ধ সেই দুটি ভিত্তির ওপরই চরম আঘাত হেনেছে। ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে পেন্টাগনের এই যুদ্ধ ব্যয়ের নথি মার্কিন ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
