বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে ধসে পড়েছিল দেশের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এস আলমের দখলমুক্ত হয়ে ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলেও, ২০২৬ সালের শুরু থেকে নতুন করে গভীর প্রশাসনিক ও পরিচালনা সংকটে পড়েছে ব্যাংকটি।
বর্তমানে কোনো পরিচালনা পর্ষদ ছাড়াই চলছে এই বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি। চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়কালে ব্যাংকটি প্রায় ৩ হাজার ২৮৫ কোটি টাকার বিশাল পরিচালন লোকসানের মুখোমুখি হয়েছে।
চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক বিতর্কিত ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া এবং পরবর্তীতে এমডি মো. ওমর ফারুক খানকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর পর ব্যাংকে অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করে। বিক্ষোভের মুখে চেয়ারম্যানের পদত্যাগের পর গত ১৪ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে পর্ষদের দায়িত্ব এবং মো. আলতাফ হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দীর্ঘদিন পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ না থাকায় ব্যাংকটির করপোরেট গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। ঋণ অনুমোদন, নতুন বিনিয়োগ, ঋণ সীমা বৃদ্ধি কিংবা বড় অঙ্কের আমদানি-রপ্তানি অর্থায়নের মতো বড় ও কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো আটকে রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে আমানত ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা থেকে আশঙ্কাজনকভাবে কমে ১ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
এর পাশাপাশি ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ রেকর্ড পরিমাণে পৌঁছেছে। চলতি বছরের জুন শেষে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট বকেয়া ঋণের প্রায় ৫২ শতাংশ এবং দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এই সংকটের বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জানান, বিকল্প ব্যবস্থা না রেখে এতদিন ধরে একটি শীর্ষ ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে ফেলে রাখা চরম উদাসীনতা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ধরনের সিদ্ধান্তের কারণেই লাভজনক হতে যাওয়া ব্যাংকটি আবার লোকসানে পড়েছে, যা বড় ধরনের বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সাবেক ব্যাংকার নুরুল ইসলাম খালিফা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত সরকারের আমলেও যোগ্য লোকদের দিয়ে পর্ষদ গঠন না করাটা হতাশাজনক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো বিশেষ মহলের অদৃশ্য এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতেই পর্ষদ গঠনে কালক্ষেপণ করছে বলে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।
অন্যান্য অর্থনীতিবিদরাও মনে করছেন, ইসলামী ব্যাংক পুনরায় সংকটে পড়লে তার নেতিবাচক প্রভাব পুরো জাতীয় অর্থনীতিতে পড়বে।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সংকট ও দুসময় অনেকটাই কেটে গেছে। বিতর্কহীন ও পুরোপুরি যোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে একটি শক্তিশালী পর্ষদ গঠনের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং খুব শিগগিরই নতুন পর্ষদ ঘোষণা করা হবে।







