ভালোবাসার টানে সব বাঁধন ও ধর্মীয় পরিচয় ভেঙে নতুন সংসার গড়েছিলেন ৩২ বছর বয়সী বৃষ্টি বিশ্বাস। প্রতিবেশী ইব্রাহিম মোল্যার প্ররোচনায় ধর্ম পরিবর্তন করে মুসলিম হয়ে তাঁকে বিয়ে করেছিলেন তিনি। কিন্তু দীর্ঘ চৌদ্দ বছর পর সেই স্বামীর বিরুদ্ধেই শারীরিক নির্যাতন, গায়ে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া এবং বসতভিটা থেকে বিতাড়নের চেষ্টার লোমহর্ষক অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী এই নারী।
ঘটনাটি ঘটেছে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ময়না ইউনিয়নে। অভিযুক্ত স্বামী ইব্রাহিম মোল্যা ওই ইউনিয়ন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী বৃষ্টি জানান, বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই ইব্রাহিমের আচরণ বদলাতে শুরু করে। দ্বিতীয় সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় ইব্রাহিম সৌদি আরব যান এবং আট বছর প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। মাদকাসক্ত হয়ে পড়া ইব্রাহিম গত তিন-চার বছর ধরে নানা অজুহাতে তাঁকে পরকীয়ার মিথ্যা অপবাদ ও সন্দেহ করতেন। এই নিয়ে নিয়মিত শারীরিক নির্যাতন ও গালিগালাজের শিকার হতে হতো তাঁকে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক অভিযোগ জানিয়ে বৃষ্টি বলেন, প্রায় দুই বছর আগে তাঁর শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে তাঁর হাত ও বুকসহ শরীরের প্রায় ২৫ শতাংশ পুড়ে যায়। দুই হাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তিনি এখনো স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারেন না। সে সময় মামলা করতে চাইলে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তাঁকে ঠাণ্ডা মাথায় ধোঁকা দেওয়া হয়েছিল।
সম্প্রতি ইব্রাহিম সালথার বাহিরদিয়া এলাকায় আরেকটি বিয়ে করেছেন। নতুন স্ত্রীকে নিয়ে বর্তমান বাড়িতে তোলার জন্য বৃষ্টি, তাঁর বৃদ্ধ শাশুড়ি এবং দুই সন্তানকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা চলছে। ইব্রাহিম তাকে তালাক দিয়েছেন বলে শুনলেও এখনো কোনো আইনি কাগজপত্র হাতে পাননি বলে জানান বৃষ্টি।
ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়িয়েছেন খোদ ইব্রাহিমের বৃদ্ধ মা জুলেখা বেগম (৬০) ও বোন শেফালী পারভীন। মা জুলেখা বেগম জানান, ছেলের অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তাঁকে পর্যন্ত মারধর ও অকথ্য ভাষায় অপমান করা হয়। নিজের মাকে নিয়ে কুৎসিত অপবাদ দেওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি। শেফালী পারভীন জানান, তাঁর ভাই একজন মাদকাসক্ত ও নির্যাতনকারী। তিনি চান, মা, ভাতিজা-ভাতিজি এবং বৃষ্টি যেন পৈতৃক ভিটায় নিরাপদে থাকতে পারেন।
এমনকি ১১ বছরের বড় ছেলে আউসও জানিয়েছে, বাবা বাড়িতে এসে গলায় ছুরি ধরে হুমকি দিত এবং পরিবারের সবাইকে প্রায়ই মারধর করত।
এদিকে অভিযুক্ত ইব্রাহিম মোল্যা তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, বৃষ্টির চরিত্র ভালো নয় এবং তাঁকে আগেই তালাক দেওয়া হয়েছে। স্ত্রীর গায়ে আগুন দেওয়ার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে উল্টো তাঁর দাবি, বৃষ্টি নিজেই নিজের শরীরে আগুন লাগিয়েছিলেন।
ময়না ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হক মৃধা জানান, মেয়েটির অসহায়ত্ব বিবেচনা করে বিষয়টির একটি মানবিক ও সুষ্ঠু সমাধানের চেষ্টা করা হবে। বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রকিবুল হাসান জানিয়েছেন, বিষয়টি তিনি শুনেছেন এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বর্তমানে দুই সন্তান ও শাশুড়িকে নিয়ে নিজের অধিকার ও নিরাপত্তার দাবিতে প্রশাসনের সর্বাত্মক সহযোগিতা চেয়েছেন সর্বস্ব হারানো বৃষ্টি বিশ্বাস।
