পাবনার সুজানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে এবং পছন্দমতো কাজ না পেয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুপ্রভা রাণীকে অবরুদ্ধ করে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় যুবদল নেতার বিরুদ্ধে। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার পর চরম নিরাপত্তাহীনতা ও প্রাণনাশের আশঙ্কায় ভুগছেন ওই নারী চিকিৎসক। জীবন বাঁচাতে তিনি বর্তমানে কর্মস্থলে যাওয়া বন্ধ রেখেছেন।
গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর ২০২৬) দুপুরে সুজানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কার্যালয়ে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত যুবদল নেতার নাম সিদ্দিকুর রহমান পিন্টু, যিনি সুজানগর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। তবে তাঁর দাবি, টেন্ডার প্রক্রিয়ার ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে কথা বলতেই তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন, কোনো ধরনের হুমকি দেওয়া হয়নি।
ভুক্তভোগী ডা. সুপ্রভা রাণী জানান, গত ১০ সেপ্টেম্বর ই-জিপি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এমএসআর খাতের ৬টি প্যাকেজে ৮০ লাখ ৭৬ হাজার টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও শতভাগ ই-জিপি নীতিমালা মেনে অনলাইনে মূল্যায়নের পর গত ২ নভেম্বর নিয়ম অনুযায়ী চারটি প্রতিষ্ঠান কাজ পায়। কিন্তু স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতা ও ঠিকাদার শর্ত কঠিন হয়েছে মর্মে দরপত্র বাতিলের জন্য বেআইনি চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেন।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি আরও জানান, মঙ্গলবার কনফারেন্স রুমে দাপ্তরিক মিটিং চলাকালে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সিদ্দিকুর রহমান পিন্টুর নেতৃত্বে আট-দশজনের একটি উচ্ছৃঙ্খল দল আকস্মিকভাবে তাঁর কক্ষে প্রবেশ করে। এ সময় তারা কক্ষের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং ভেতরের সিসি ক্যামেরা ঘুরিয়ে দেয়। পরে কক্ষের ছিটকিনি লাগিয়ে তাঁকে অবরুদ্ধ করে জোরপূর্বক রি-টেন্ডারের জন্য চাপ সৃষ্টি করে।
ন্যায্য ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পরিবর্তন করতে রাজি না হওয়ায় ওই রাজনৈতিক নেতারা তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং অফিসের বাইরে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার মুখে বর্তমানে তিনি দাপ্তরিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছেন না। মৌহিকভাবে স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি জানানোর পাশাপাশি সিভিল সার্জন বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. ওয়াসিম খান জানান, যারা টেন্ডার পাননি, তারা এসে কার্যালয়ে হট্টগোল শুরু করেন। খবর পেয়ে তিনি ম্যাডামের কক্ষে গিয়ে দেখেন সিসি ক্যামেরা উল্টানো রয়েছে এবং উচ্ছৃঙ্খল ছেলেরা সেখানে অবস্থান করছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে থানায় খবর দিলে পুলিশ কর্মকর্তা উপস্থিত হন। তবে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য হওয়া সত্ত্বেও প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তাঁর জানা ছিল না বলে জানান তিনি।
এদিকে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে সুজানগর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সিদ্দিকুর রহমান পিন্টু দাবি করেন, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। বৈধ ঠিকাদারি লাইসেন্স থাকার পরও স্থানীয়দের বাদ দিয়ে গোপন অভিসন্ধি করে ঝিনাইদহ থেকে ঠিকাদার এনে কাজ দেওয়া হয়েছে এবং বিশেষ শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তার স্বামী এসব অনৈতিক সুবিধার সাথে জড়িত ছিলেন দাবি করে তিনি বলেন, তাঁরা কেবল নিয়মের কথা বলতে গিয়েছিলেন, কাউকে অবরুদ্ধ বা প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়নি।
পাবনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, সুজানগরে সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সম্প্রতি টেন্ডার বা কাজ না পেলেই বিভিন্ন দপ্তরে কর্মকর্তাদের হেনস্তা করার প্রবণতা বেড়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য। তিনি ওই স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে কিছুদিন নিরাপদে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন এবং এ বিষয়ে দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন।
সুজানগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাফফর হোসেন জানান, ঘটনার দিন হাসপাতাল থেকে ফোনে তাঁকে ডাকা হয়েছিল। সেখানে গিয়ে কিছু লোকজনকে দেখা গেলেও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করে রাখার সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ তখন তাঁকে জানানো হয়নি। পুলিশ কর্মকর্তা নামাজে যাওয়ার সুযোগে ওই চিকিৎসক চলে যান। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি, অভিযোগ পেলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।







