শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার নলকুড়া ইউনিয়নের ভারুয়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের নতুন কমিটি গঠন ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের হামলায় মসজিদ কমিটির নবনির্বাচিত সভাপতি ও স্থানীয় বিএনপি নেতা আলহাজ্ব আবু সালেহ আহমেদ (মৃত্যুকালে বয়স বিবেচনাধীন) নিহত হয়েছেন। শুক্রবার (৬ নভেম্বর ২০২৬) দুপুরে জুমার নামাজের ঠিক আগে মসজিদের ভেতরে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
নিহত আবু সালেহ আহমেদ ঝিনাইগাতীর ভারুয়া বাজার এলাকার মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে। তিনি নলকুড়া ইউনিয়ন বিএনপির ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এ ঘটনায় নিহতের ছেলে জাকির হোসেন উজ্জ্বল বাদী হয়ে ঝিনাইগাতী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় নলকুড়া ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি এবং একই গ্রামের ছবের আলী তালুকদারের ছেলে আব্দুল মতিনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এছাড়াও এ মামলায় আরও ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহতের পরিবারের সূত্রে জানা যায়, ঘটনার প্রায় ২০-২৫ দিন আগে স্থানীয় মুসল্লিরা সর্বসম্মতিক্রমে ভারুয়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের নতুন কমিটি ঘোষণা করেন, যেখানে আবু সালেহ আহমেদকে সভাপতি করা হয়। ওই সময় মসজিদের সাবেক সভাপতি আব্দুল মতিন একটি মামলায় কারাগারে ছিলেন। কিছুদিন আগে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তিনি এই নতুন কমিটিকে অবৈধ ঘোষণা করেন, যা নিয়ে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়।
নিহতের ভাতিজা গোলাম মোস্তফা জানান, সমাজের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের সমর্থনে তার চাচা সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু জেল থেকে বেরিয়ে আব্দুল মতিন ও তার অনুসারীরা শুরু থেকেই এই কমিটির তীব্র বিরোধিতা করে আসছেন।
ঘটনার দিন শুক্রবার জুমার নামাজের আগে মসজিদে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত হয়ে বিষয়টি নিয়ে কথা বলছিলেন। দুপুর ১টা ৩৪ মিনিট বেজে যাওয়ায় মুসল্লিরা দ্রুত খুতবা শুরু করার অনুরোধ জানান। ঠিক সেই মুহূর্তে আব্দুল মতিন বক্তব্য দিতে চাইলে অপর পক্ষ আপত্তি জানিয়ে তাকে নামাজের পরে কথা বলার অনুরোধ করে।
গোলাম মোস্তফার অভিযোগ, ইউপি চেয়ারম্যান ও মসজিদ কমিটির সভাপতি আবু সালেহ আহমেদ নামাজ শেষে বিস্তারিত আলোচনার অনুরোধ জানালেও আব্দুল মতিন তা তোয়াক্কা করেননি। উল্টো তার ভাই ময়না এবং ১০-১৫ জন অনুসারীসহ তারা আকস্মিক চড়াও হয়ে সভাপতি আবু সালেহ আহমেদের ওপর নৃশংস হামলা চালান। তাদের নির্বিচার মারধর ও আঘাতে ঘটনাস্থলেই তার চাচার মৃত্যু হয়।
এদিকে ঘটনার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছেন নলকুড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রোকনুজ্জামান রঞ্জু। তিনি জানান, জুমার নামাজের আগে মসজিদে সৃষ্ট উত্তেজনা নিরসনে আলোচনা চলছিল। আব্দুল মতিন বক্তব্য রাখতে চাইলে অপর পক্ষ তাতে বাধা দেয়। এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে উচ্চবাচ্য শুরু হলে তিনি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। এর মধ্যেই আবু সালেহ আহমেদ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু ঘটে।
অভিযুক্ত আব্দুল মতিনের বক্তব্য নেওয়ার জন্য যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে তার ভাই ময়নাসহ অভিযুক্তদের পরিবারের অন্য সদস্যরা হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, আবু সালেহ আহমেদ আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন এবং মসজিদের ভেতরে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে স্ট্রোক করে তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ঝিনাইগাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম নূর মোহাম্মদ জানান, এ ঘটনায় নিহতের ছেলের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে এবং ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ জেলা হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত শুরু করেছে এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
