এক সময় ভারতের শিক্ষা সংস্কার ও উদ্ভাবনের প্রতীক ছিলেন সোনম ওয়াংচুক — যার জীবনগাঁথা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মিত হয় বলিউডের বিখ্যাত চলচ্চিত্র থ্রি ইডিয়টস। কিন্তু মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে সেই ওয়াংচুক এখন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের চোখে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’।
২০১৯ সালের ৫ আগস্ট জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের সময় ওয়াংচুক প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। সেই সময় লাদাখকে পৃথক প্রশাসনিক অঞ্চল ঘোষণা করা হয়। কিন্তু নির্বাচিত কোনো বিধানসভা না থাকায় ধীরে ধীরে লাদাখবাসী নিজেদের রাজনৈতিকভাবে বঞ্চিত বোধ করে। এই অবহেলা ও কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে লাদাখের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে এর নেতৃত্ব দেন ওয়াংচুক।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর ওয়াংচুককে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে (NSA) গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ— সরকারবিরোধী আন্দোলন উসকে দেওয়া ও রাষ্ট্র উৎখাতের ষড়যন্ত্র করা। গ্রেপ্তারের পরপরই লাদাখজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে চারজন বিক্ষোভকারী নিহত হন। পরে আন্দোলনকারীরা বিজেপির স্থানীয় কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করলে কর্তৃপক্ষ ওয়াংচুককে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগে দায়ী করে।
একসময় বিজেপির নির্বাচনি প্রচারে ব্যবহৃত এই বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদকেই এখন কেন্দ্র সরকার ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ বলছে।
ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো বলেন, “যে সরকার এক মাস আগেও তাকে সম্মান দিচ্ছিল, সেই সরকারই এখন তাকে দেশবিরোধী বলছে। এটা আসলে তাকে ভয় দেখানোর কৌশল, কারণ তারা তাকে কিনতে পারেনি।”
জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় ওয়াংচুককে বিচার ছাড়াই এক বছর পর্যন্ত আটক রাখা যেতে পারে। এর প্রতিবাদে লাদাখের এক ডজনেরও বেশি কর্মী আত্মসমর্পণ করে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন।

লাদাখ পুলিশ দাবি করেছে, ওয়াংচুকের আন্দোলনের সঙ্গে পাকিস্তানের যোগসাজশ রয়েছে। তারা জানিয়েছে, সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া এক পাকিস্তানি গোয়েন্দা এজেন্ট ওয়াংচুকের প্রতিবাদের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছিল। এছাড়া ইসলামাবাদে জাতিসংঘ ও ডন পত্রিকার আয়োজিত এক জলবায়ু সম্মেলনে তার অংশগ্রহণকেও সন্দেহজনক বলা হচ্ছে — যদিও সেখানে ওয়াংচুক মোদির জলবায়ু উদ্যোগের প্রশংসা করেছিলেন।
১৯৬৬ সালে লাদাখের উলেইটোকপো গ্রামে জন্ম ওয়াংচুকের। ১৯৮৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শিক্ষা সংস্কারের প্রতিষ্ঠান ‘সেকমোল’ (SECMOL), যা লাদাখে শিক্ষায় বিপ্লব ঘটায়। তার উদ্ভাবিত আইস স্তূপা (Ice Stupa) বরফ সংরক্ষণ প্রযুক্তি ও সোলার তাঁবু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। ২০১৮ সালে তিনি পান র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার, যা এশিয়ার নোবেল নামে পরিচিত।
কিন্তু জলবায়ু ও পরিবেশবিষয়ক আন্দোলনের পাশাপাশি লাদাখের সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে সরব হওয়ায় ধীরে ধীরে সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে।
ওয়াংচুকের গ্রেপ্তারের পর লাদাখে সংকট আরও গভীর হয়েছে। তার মুক্তি ও নিহত বিক্ষোভকারীদের ক্ষতিপূরণের দাবিতে আন্দোলনকারীরা সরকারের সঙ্গে সংলাপ বর্জন করেছে। এ অবস্থায় লেহর ব্যবসায়ী স্ট্যানজিন দোরজে, যিনি ওয়াংচুকের অনুসারী ছিলেন, দমন–পীড়নের মধ্যে গৃহবন্দি অবস্থায় আত্মহত্যা করেন।
লাদাখ বৌদ্ধ সমিতির সভাপতি বলেন, “ওয়াংচুকের গ্রেপ্তার তাকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, ওয়াংচুক লাদাখের স্বাধীন চেতনার প্রতীক।”
যিনি একসময় ভারতের গর্ব, উদ্ভাবনের মুখ ও যুবসমাজের অনুপ্রেরণা ছিলেন — আজ সেই সোনম ওয়াংচুক রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আসামি। লাদাখের এই আন্দোলন এখন শুধু এক ব্যক্তির মুক্তির দাবি নয়, বরং হয়ে উঠেছে স্বায়ত্তশাসন, পরিবেশ ও গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন— যা ক্রমে ভারতের জন্যও বড় রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হচ্ছে।







