গত সাড়ে ১৫ বছরে আওয়ামী শাসনের সময়ে দেশে পর্দানশীন নারীদের বৈঠক করা যেন ছিল অঘোষিত অপরাধ। বিশেষ করে মহিলা জামায়াতের নেতাকর্মীদের একত্রে বসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ইসলামী বই বা ধর্মীয় আলোচনাকে কেন্দ্র করে এমন কোনো আয়োজনের খবর পেলেই ‘জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা’ ও ‘রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড’-এর অভিযোগ তুলে অভিযান চালানো ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত চর্চা।
সেই সময়ে কোরআন-হাদিস আলোচনা বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকেও অসংখ্য নারী কর্মীকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি গর্ভবতী নারী কিংবা ছোট শিশুসহ মায়েরাও রেহাই পাননি। ফলে চরম প্রতিকূল পরিবেশে সাধারণ নারী সদস্যরা দলীয় কার্যক্রমে আগ্রহ হারান।
তবে জুলাই বিপ্লবে স্বৈরশাসনের পতনের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। অনুকূল পরিবেশে জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগ এখন পুনরায় সংগঠিত হয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড জোরদার করেছে। সাংগঠনিক কর্মকৌশল ও কর্মপরিধি বৃদ্ধি করে তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতেও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশজুড়ে মহিলা জামায়াতের তৎপরতা চোখে পড়ার মতোভাবে বেড়েছে।
দলীয় সূত্র জানায়, জামায়াতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী মহিলা বিভাগ একটি স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে কাজ করে। এতে উল্লেখ আছে—কার্যক্রম পরিচালনার জন্য “কেন্দ্রীয় মহিলা মজলিসে শূরা” গঠন করা হবে, যেখানে সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে সেক্রেটারি (মহিলা বিভাগ) হিসেবে নিয়োগ দেবেন জামায়াতের আমির। বর্তমানে সংগঠনটির নেতৃত্বে প্রায় ৪৫ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব করছে বলে জানা গেছে।
আগে মহিলা জামায়াতের কার্যক্রম ঘরোয়া পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তাদের উপস্থিতি দৃশ্যমান। সংরক্ষিত নারী আসনে প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রচারণায়ও তারা ভূমিকা রাখছেন। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে মহিলা বিভাগের কর্মতৎপরতা গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সভা, সমাবেশ ও মানবিক কার্যক্রমে তাদের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
কেন্দ্রীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে নারীবিষয়ক সংস্কার প্রস্তাবে ইসলামবিরোধী ধারা অন্তর্ভুক্তির প্রতিবাদে মহিলা জামায়াত দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছে। এছাড়া ২১ জুলাই ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে জামায়াত আমিরের বৈঠকে প্রথমবারের মতো মহিলা নেত্রীদের উপস্থিতিও দেখা যায়। সেখানে রাষ্ট্রদূতকে জামদানি শাড়ি উপহার দেওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে। পরে বিভিন্ন কূটনীতিকের সঙ্গেও তারা বৈঠক করেছেন, যেখানে নারী উন্নয়ন ও নিরাপত্তা ইস্যুতে জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা জানিয়েছেন, সংগঠনের চার দফা কর্মসূচির আওতায় মহিলা বিভাগও সমানভাবে সক্রিয়। তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নারীদের কোরআন-সুন্নাহর আলোকে জীবন গঠনের দাওয়াত দিচ্ছেন এবং সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছেন। পাশাপাশি দরিদ্র নারীদের জন্য আর্থিক সহায়তা, চিকিৎসা, প্রসূতি সেবা ও সুদমুক্ত ঋণসহ নানা সামাজিক সেবা কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।
তারা বলেন, “স্বৈরশাসনের সময় আমাদের বহু কর্মী গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু এখন আমরা ভয়মুক্ত পরিবেশে কাজ করতে পারছি। সাধারণ নারীদের অংশগ্রহণ ও সমর্থন আশাতীতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।”
দলীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে মহিলা বিভাগের সাংগঠনিক প্রচেষ্টা বেড়েছে। রুকন ও কর্মী বৃদ্ধির পাশাপাশি তৃণমূল নেতারা জনসংযোগে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। ইসলামী জীবনচর্চার আহ্বানের সঙ্গে সঙ্গে তারা নির্বাচনে সৎ নেতৃত্ব তথা জামায়াত প্রার্থীদের সমর্থনের আহ্বান জানাচ্ছেন।
কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক ডা. হাবিবা আক্তার চৌধুরী সুইট বলেন, “জামায়াত নারীদের ঘরে বন্দি রাখতে চায়—এ ধারণা ভুল। আমরা চাই, নারীরা তাদের যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী সমাজে অবদান রাখুক। বর্তমানে মজলিসে শূরা ও নির্বাহী পরিষদে ৪৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধি রয়েছেন। সামাজিক নৈতিকতা ও মূল্যবোধ ছাড়া নারীর প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।”
নারী অধিকার সংগঠন ‘নারী প্রয়াস’-এর সেক্রেটারি ড. ফেরদৌস আরা খানম বলেন, “মহিলা জামায়াতের বর্তমান কার্যক্রমকে আমি ইতিবাচকভাবে দেখি। দীর্ঘদিনের দমন-নিপীড়নের পর তারা এখন নতুন উদ্যমে কাজ করছে। দেশ ও জাতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হওয়া উচিত।”
তিনি আরও বলেন, “জামায়াতের অনেক মহিলা নেতা শিক্ষা, ব্যবসা ও সমাজসেবায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে জাতীয় উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।”
মহিলা জামায়াতের এই ক্রমবর্ধমান তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে—রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীদের অংশগ্রহণ এখন দলের কৌশলগত পরিকল্পনার অন্যতম অগ্রাধিকার।







