যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হলেও দেশটির সরকারকে পতন ঘটানো সম্ভব হয়নি। বরং হরমুজ প্রণালীতে শক্ত অবস্থান নিয়ে ইরান এখন পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়, দুই সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী বিমান যুদ্ধের পর ইরান বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত করছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। এতে উপসাগরীয় অঞ্চলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়েছে।
গত ২৮ এপ্রিল মার্কিন-ইসরাইলি হামলার প্রথম দিন তেহরানের আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেলেও বর্তমান পরিস্থিতি তখনকার তুলনায় অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। কয়েক বছরের গোয়েন্দা তৎপরতা ও পরিকল্পনার পর তেহরানের একটি আবাসিক এলাকায় হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। এতে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হলেও সামরিক কাঠামো ভেঙে পড়েনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের বিকেন্দ্রীকৃত ‘মোজাইক প্রতিরক্ষা’ কৌশলের কারণে শীর্ষ নেতৃত্ব হারালেও সামরিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বজায় রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্প পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, কিছু সিনিয়র নেতাকে হারালেও ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো বেশ স্থিতিশীল রয়েছে।
তার মতে, ইরান বর্তমানে তিন ধাপের কৌশল অনুসরণ করছে—প্রথমত টিকে থাকা, দ্বিতীয়ত পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা ধরে রাখা এবং তৃতীয়ত যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করা, যাতে নিজেদের শর্তে এর সমাপ্তি ঘটানো যায়।
এদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দুবাইয়ের মেরিনা এলাকা ও সমুদ্রে থাকা তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে যুদ্ধের প্রভাব তুরস্ক, সাইপ্রাস ও উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে।
লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরাইলের পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলছে। একই সঙ্গে ইরান হরমুজ প্রণালী প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। উল্লেখ্য, এই পথ দিয়েই বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হয়।
এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার মতো তেল আমদানিকারক দেশগুলোতেও জ্বালানি রেশনিং শুরু হয়েছে। তেল আমদানিকারক দেশগুলো জরুরি মজুদ থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বাজারে ছাড়লেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা যাচ্ছে না।
যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক বাণিজ্যেও। পরিবহন খরচ, বিমা ও জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় কেনিয়ার চা ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় অনেক বিদেশি নাগরিক সেখান থেকে চলে যাচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। সামনে কংগ্রেস নির্বাচন থাকায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধি নিয়ে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। অনেক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও হোয়াইট হাউসকে সতর্ক করছেন যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে নির্বাচনে তাদের আসন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে ইরানও অর্থনৈতিকভাবে চাপে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশটি ধীরে ধীরে এমন এক পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে যেখানে সরকার টিকে থাকলেও জনগণের বেতন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো ‘বিজয়’-এর সংজ্ঞা পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারে। শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য থেকে সরে এসে তারা হয়তো দাবি করতে পারে যে খামেনিকে হত্যা করাই ছিল এই অভিযানের মূল সাফল্য।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রকে সহজে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেবে না। ফলে ট্রাম্পের সামনে কঠিন দুটি পথ খোলা থাকতে পারে—স্থলবাহিনী নামিয়ে সরাসরি যুদ্ধ শুরু করা অথবা ইরানের বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা দিয়ে দেশটিতে অভ্যন্তরীণ সংঘাত বাড়ানো।
বর্তমানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ছে।
সূত্র: বাসস







