হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বলে যে ধারণা প্রচলিত রয়েছে, আন্তর্জাতিক তথ্য বিশ্লেষণে তার ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে। বর্তমানে এই প্রণালিটি সবার জন্য উন্মুক্ত ধমনী থেকে বদলে গিয়ে একটি ‘নিয়ন্ত্রিত করিডোরে’ পরিণত হয়েছে। যদিও পশ্চিমা দেশগুলোর জাহাজ চলাচল ৯০ শতাংশ কমেছে, কিন্তু ইরানের ‘ডার্ক ফ্লিট’ বা গোপন জাহাজের বহরের মাধ্যমে তেলের প্রবাহ এখনো সচল রয়েছে।
ইরান দীর্ঘদিনের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এই সমান্তরাল ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা এখন তাদের ভূ-রাজনৈতিক শক্তির বড় হাতিয়ার। অস্বচ্ছ মালিকানা, সিগন্যাল বন্ধ রাখা এবং মাঝসমুদ্রে পণ্য স্থানান্তরের মাধ্যমে ইরান প্রতিদিন ১৫ থেকে ১৭ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে। এই প্রবাহের বড় অংশই শেষ পর্যন্ত চীনের বাজারে পৌঁছাচ্ছে। শুধু মার্চ মাসেই প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল তেল এই রহস্যময় উপায়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজের দৃশ্যমান জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়া মানেই সরবরাহ বন্ধ হওয়া নয়। ইরানের অন্তত ২৫টি তেলবাহী ট্যাংকার এই ‘শায়া ফ্লিট’ হিসেবে কাজ করছে। এছাড়া ওমান উপসাগরের জাস্ক টার্মিনাল ব্যবহার করে প্রণালি এড়িয়েও তেল পাঠানোর বিকল্প ব্যবস্থা রেখেছে তেহরান। বর্তমানে সমুদ্রে প্রায় ১৪ কোটি ব্যারেল তেল ভাসমান স্টোরেজ হিসেবে জমা আছে, যা ইরানের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখছে।
সবচেয়ে বড় সত্য হলো, পশ্চিমা দেশগুলো এই গোপন প্রবাহ সম্পর্কে জানলেও তা পুরোপুরি বন্ধ করছে না। কারণ বিশ্ববাজার থেকে ইরানি তেলের সরবরাহ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করলে জ্বালানির দামে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ফলে বর্তমানে এক ধরণের ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ বা নীরব সহনশীলতা বজায় রাখা হচ্ছে। একদিকে নিষেধাজ্ঞা চলছে, অন্যদিকে বাজারের ভারসাম্য রক্ষায় এই গোপন বাণিজ্যকে সহ্য করা হচ্ছে।
তবে এই নতুন বাজার কাঠামো দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বৈশ্বিক তেল ব্যবস্থা এখন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে—একটি স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত, অন্যটি রাজনৈতিকভাবে চালিত ও অস্বচ্ছ। ইরানের এই পুরোনো ও দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণের জাহাজগুলো যেকোনো সময় বড় ধরণের দুর্ঘটনা বা পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। লজিস্টিকস নিয়ন্ত্রণ এখন উৎপাদনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত ধাক্কার মুখে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।







