ভারতীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে জাতিগত বাঙালি মুসলমানদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বাংলাদেশ সীমান্তে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়ার (পুশব্যাক) অভিযোগ এনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি দাবি করেছে, পশ্চিমবঙ্গে নতুন প্রশাসনিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে হাজার হাজার মানুষকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এইচআরডব্লিউর অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণস্বরূপ ভোটার পরিচয়পত্র, আধার কার্ডসহ বিভিন্ন বৈধ নথি থাকা সত্ত্বেও তাদের বিদেশি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) একাধিকবার বাংলাদেশ সীমান্তে পুশব্যাক কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করেছে। এর মধ্যে পঞ্চগড় সীমান্তে কয়েকটি পরিবারকে প্রায় ৭৫ ঘণ্টা ‘জিরো লাইনে’ আটকে থাকার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ওই পরিবারগুলো দীর্ঘ সময় খাদ্য, পানি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দাবি, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কথিত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত, আটক ও বহিষ্কারের লক্ষ্যে একটি বিশেষ নীতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই নীতির আওতায় বহু মানুষকে যথাযথ তদন্ত, শুনানি বা আদালতের আদেশ ছাড়াই সীমান্ত এলাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংস্থাটি আরও অভিযোগ করেছে, অনেকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের নাগরিকত্ব বা বসবাসের বৈধতা প্রমাণের পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা নিজেদের পক্ষে আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। এইচআরডব্লিউর মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, শরণার্থী সুরক্ষা নীতি এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কোনো ব্যক্তিকে তার পরিচয়, ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্বিচারে আটক বা বহিষ্কার করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের পরিপন্থি। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সীমান্ত অঞ্চলে মানবিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে এবং দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক জটিলতাও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় দেশের সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার নীতিমালা অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে জোরপূর্বক বহিষ্কার, পুশব্যাক এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া নাগরিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
সংস্থাটি আরও বলেছে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও অভিবাসন-সংক্রান্ত যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় নিরপরাধ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও বিঘ্নিত হতে পারে।







